img

খোলাফায়ে রাশেদীনের শাসনামল শেষ হলে, উমাইয়া বংশের উত্থান ঘটে ৬৬১ সালে। তাদের হাত ধরে মুসলিম শাসনের ভিত্তি আরো শক্ত হয় এবং একই সাথে বিস্তৃতি ঘটে সাম্রাজ্যের। সামরিক একের পর এক অভিযানে আসতে থাকে যুগান্তকারী বিজয়। স্পেন বিজয়ও তেমনি ঐতিহাসিক ও অবিস্মরণীয় ঘটনা, যা ইউরোপের বুকে ইসালমের মশাল প্রজ্জ্বলিত করে।

চতুর্থ শতাব্দীর শেষ দিকে হিস্প্যানিয়া অঞ্চলে (বর্তমান স্পেন ও পর্তুগাল) রোমান শাসনের পতন ঘটলে তাদের জায়গা দখল করে নেয় পিরেনিজ পার হয়ে আইবেরীয় উপদ্বীপে পা রাখা বিভিন্ন ভিজিগথিক গোত্র। টলেডোতে স্থাপন করা হয় নতুন রাজধানী। তারা খুব দ্রুতই রোমান সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, ল্যাটিন ভাষায় কথা বলা এই ভিজিগথরা আরিয়ান ধর্ম পালন করতো। সপ্তম শতাব্দীর শেষ দিকে ভিজিগথিক হিস্প্যানিয়ায় তখন অরাজকতার স্টিমরোলার চলছে, রাজনৈতিক কামড়াকামড়ির পাশাপাশি দুর্নীতি আর চোর-ডাকাতের উপদ্রব তো রয়েছেই। স্পেনের দিকে চোখ পড়েছে তখন অন্য এক পক্ষের। ইসলামের সুবাতাস লোহিত সাগর পাড়ি দিয়ে চলে এসেছে আফ্রিকায়, ভূমধ্যসাগরের তীর ধরে পুরো উত্তর আফ্রিকার উপকূল জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে মুসলিমরা।

স্পেনে মুসলিম অভিযান:
৬৯৮ সালে মুসা বিন নুসায়েরকে ইফরিকিয়ার (লিবিয়া ও আলজেরিয়ার অংশবিশেষ) গভর্নর বানানো হলো। তার পরবর্তী কাজ হলো সমগ্র উত্তর আফ্রিকার উপকূলে মুসলিমদের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। মুসা বিন-নুসায়ের ঠিক তা-ই করলেন, এমনকি তাঞ্জিয়ার্সেও ঢুকে পড়লেন। বাইজানটাইন নৌবহরের মুখোমুখি হওয়ার জন্য নিজেও গড়ে তুললেন ছোটখাট কিন্তু শক্তিশালী নৌবহর।

খ্রিস্টান এবং মুসলিম উভয় সূত্রমতেই মুসা বিন নুসায়ের শুধুমাত্র আফ্রিকা জয় করেই সন্তুষ্ট ছিলেন, কিন্তু স্পেন থেকে আসা এক অভিজাত খ্রিস্টান তাকে উদ্বুদ্ধ করে হিস্প্যানিয়া জয় করার জন্য। এই ব্যক্তি ছিলেন সেউটার কাউন্ট হুলিয়ান, ভিজিগথ রাজা প্রথম রডারিকের একজন সামন্ত রাজা। হুলিয়ান মুসা বিন নুসায়েরকে হিস্প্যানিয়ায় থাকা সম্পদের পাহাড়ের বিবরণ দিলেন, সাথে বললেন রডারিকের কারণে তাদের রাজ্যে চলা অরাজকতার গল্প। কিংবদন্তী অনুযায়ী, হুলিয়ান চেয়েছিলেন ভিজিগথদের পতন দেখতে, কারণ রডারিক তার মেয়েকে ধর্ষণ করেছিলেন।

মুসা বিন নুসায়ের তার সেরা সেনাপতিকে পাঠালেন হিস্প্যানিয়া জয় করতে, তাঞ্জিয়ার্সের তৎকালীন গভর্নর তারিক বিন জিয়াদকে। তারিক বিন জিয়াদ সদ্য ইসলাম গ্রহণ করা এরকম ৭,০০০ সৈন্য নিয়ে পাড়ি জমালেন হিস্প্যানিয়ার উদ্দেশ্যে। তারিক নিজেই ছিলেন মুসা বিন নুসায়েরের একজন দাস, পরবর্তীতে মুসা তাকে মুক্ত করে দিয়ে তাকে বাহিনীর সেনাপতি বানান।

এপ্রিল ২৬, ৭১১। তারিক বিন জিয়াদ তার বাহিনী নিয়ে জিব্রাল্টারে পা রাখলেন । এই পুঁচকে বাহিনীর মুখোমুখি হতে রডারিক জড়ো করেছিলেন প্রায় এক লক্ষ সৈন্য। এমন সময় তারিক আদেশ দিলেন পিছনে থাকা নিজেদের জাহাজ পুড়িয়ে দিতে। জিব্রাল্টারের নামকরণ করা হয়েছে তারিক এর নামানুসারেই। ‘জাবাল-আত-তারিক’ অর্থাৎ তারিকের পাহাড় থেকেই উৎপত্তি জিব্রাল্টারের নাম। আর ঠিক এখানেই তারিক বিন জিয়াদ সৈন্যদের উদ্দেশ্যে তার ইতিহাস বিখ্যাত ভাষণ দিলেন।

“হে আমার সৈন্যরা, কোথায় পালাবে তোমরা? তোমাদের পিছনে সাগর, সামনে শত্রু। তোমাদের সামনে রয়েছে অগণিত শত্রু, আর জীবন বাঁচানোর জন্য তোমাদের কাছে রয়েছে শুধু তলোয়ার।... এবং মনে রেখো এই অসাধারণ যুদ্ধে আমিই সবার সামনে থাকবো যা তোমরা করতে যাচ্ছ...”

তারিকের ভাষণ শুনে উজ্জীবিত সৈন্যরা ঝাঁপিয়ে পড়লো রডারিকের বিশাল বাহিনীর উপর। রডারিকের বাহিনী তখন দ্বিধাবিভক্ত, নিজেদের সুরক্ষিত শহর ছেড়ে এই প্রান্তরে যুদ্ধ করতে এসে যারপরনাই বিরক্ত সামন্ত রাজারা। তাছাড়া এই বিশাল বাহিনী রডারিকের অনুগতও নয়। এই সুযোগটাই কাজে লাগালো মুসলিমরা। তারিকের ৭ হাজার সৈন্যের সাথে যোগ হওয়া মুসা বিন নুসায়েরের পাঠানো আরো ৫ হাজার সৈন্যের অসাধারণ রণকৌশলে মুহূর্তের মধ্যেই ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলো ভিজিগথ বাহিনী। গুয়াদেলেতের যুদ্ধে নিহত হলো রডারিক, হিস্প্যানিয়ায় প্রতিষ্ঠিত হলো মুসলিম শাসন।

ইউরোপে নতুন সভ্যতার উন্মষ:

পরের বছরেই উত্তর আফ্রিকার আমাজিঘদের (বারবার) ঢল নেমে এল আইবেরিয়ায়। জিব্রাল্টার থেকে দক্ষিণ ফ্রান্স পর্যন্ত মুসলিমদের দখলে চলে আসলো। মুসলিম শাসন সত্ত্বেও খ্রিস্টান আর ইহুদিরা স্বাধীনভাবেই নিজেদের ধর্ম পালন করতে পারতো, তাদের উপর জোর করে ধর্ম চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়নি। আর এ কারণেই কয়েক বছরের মধ্যেই ব্যাপক পরিমাণ খ্রিস্টান ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিল। দশম শতাব্দীর মধ্যেই আল-আন্দালুস পরিণত হলো ইউরোপ, আফ্রিকা আর মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে সফল রাষ্ট্র হিসেবে। পণ্ডিতরা চর্চা করতে থাকলো বিজ্ঞান-দর্শনশাস্ত্রের, থেমে যাওয়া প্রাচীন গ্রিক সভ্যতার জ্ঞান-বিজ্ঞান আবারো আলোর মুখ দেখলো তাদের হাত ধরে। অন্যদিকে খ্রিস্টধর্ম প্রধান ইউরোপ তখন নিজেদের মধ্যেই ক্ষমতার রেষারেষিতে ব্যস্ত, রেনেসাঁ শুরু হওয়ার পূর্ববর্তী ‘ডার্ক এজ’ চলছে তখন ইউরোপে। তাছাড়া ইউরোপ, ভূমধ্যসাগর আর আফ্রিকান আটলান্টিক দিয়ে ঘিরে থাকা আল-আন্দালুস হয়ে দাঁড়ালো ব্যবসা-বাণিজ্যের পীঠস্থান।

৭৫০ খ্রিস্টাব্দে, উমাইয়া খিলাফতের পতনের পর মুসলিম বিশ্বে শুরু হয় আব্বাসীয় যুগ। গণহত্যার সময় উমাইয়া পরিবারের বেঁচে যাওয়া রাজপুত্র আবদ আল-রহমান পালিয়ে আন্দালুসে চলে আসেন। সেখানেই শুরু হয় তার নতুন রাজ্য-শাসন, আল-আন্দালুসকে ঘোষণা করেন স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে। দামেস্ক আর বাগদাদের সাথে শুরু হয় অঘোষিত ইসলামিক সাংস্কৃতিক যুদ্ধ। ৭৫৬ সালে নিজেকে আল-আন্দালুসের আমির হিসেবে ঘোষণা করেন আবদ আল-রহমান, ইউরোপের বুকে প্রতিষ্ঠিত হয় প্রথম স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র।


মুসলিম স্পেন এর বিবরণ:
পূর্বের আরব রাষ্ট্র কিংবা ইউরোপের খ্রিস্টান রাষ্ট্রগুলোকে সবদিক থেকেই ছাড়িয়ে গিয়েছিলো আল-আন্দালুস। রোমানদের কাছ থেকে ধার নেওয়া ইঞ্জিনিয়ারিং আর শহরের পরিকল্পনার সাথে ইসলামি স্থাপত্যকলা মিশিয়ে নতুন করে গড়া হলো আন্দালুসের শহরগুলো। ভ্যালেন্সিয়া আর সেভিল ছিল বর্তমানের দুবাই কিংবা দোহার মতো বিলাসবহুল শহর। জাতিভা শহরে তখন চালু করা হয়েছে কাগজের কারখানা, দুষ্প্রাপ্য আর দামী পার্চমেন্টকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করে শুরু হলো বই তৈরি করার বিপ্লব। কালের গর্ভে নষ্ট হয়ে যাওয়া মিশরীয় আর গ্রিক ডকুমেন্টগুলো বইয়ের আকার পেতে শুরু করলো। শহরে শহরে তৈরি করা হলো হাম্মামখানা, জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হলো। নারীরা, বিশেষ করে অভিজাতরা মধ্যযুগীয় খ্রিস্টানদের তুলনায় অনেক বেশি স্বাধীনতা ভোগ করতো।

ইসলামের জিম্মা ব্যবস্থার কারণে অন্যান্য ধর্মের লোকেরাও সমানভাবে নিজেদের ধর্ম পালন করার সুযোগ পেত, নিজস্ব সম্প্রদায়ের নিয়ম-কানুন, উৎসবসহ সবকিছুই নিজেরাই নিয়ন্ত্রণ করতে পারতো। যদিও তাদেরকে এজন্য নির্দিষ্ট পরিমাণে ‘জিযিয়া কর’ দিতে হতো। খ্রিস্টানরা একদিকে যেমন নিজেদের ধর্ম পালন করতো, অন্যদিকে তাদেরকে ইসলামের দাওয়াতও দেওয়া হতো। এর ফলে আন্দালুসে থাকা অনেক খ্রিস্টান আর ইহুদি ধর্মান্তরিত হয়েছিল। ধর্মান্তরিত না হওয়া খ্রিস্টান আর ইহুদিরাও কিছুটা ইসলামি সংস্কৃতিতে প্রভাবান্বিত হয়েছিল। সূত্র: ইসলামিক হিস্টোরি ও উইকিপিডিয়া

এই বিভাগের আরও খবর


সর্বশেষ