img

গণশুনানি শেষে প্রস্তুতি চলছে গ্যাসের নতুন মূল্যহার ঘোষণার। চলতি মাসের মাঝামাঝি নাগাদ এ মূল্যহার ঘোষণা করা হবে। এ দফায় আবাসিক ও বাণিজ্যিক খাত বাদে সব শ্রেণীর গ্যাসের দাম বাড়ছে গড়ে প্রায় ৩০ শতাংশ। 

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) সূত্রমতে, নতুন মূল্যহারে প্রতি ইউনিট গ্যাসের গড় ভারিত মূল্য হবে ৯ থেকে সাড়ে ৯ টাকা। সব খাতে গ্যাসের বিদ্যমান মূল্য ইউনিটপ্রতি গড়ে ৭ টাকা ৩৯ পয়সা। এ নতুন মূল্য কার্যকর হলে ইউনিটপ্রতি গড়ে ২ টাকার বেশি বাড়তি পরিশোধ করতে হবে গ্রাহকদের। তবে সবচেয়ে বেশি বাড়ছে শিল্প, বিদ্যুৎ ও সার কারখানায় ব্যবহূত গ্যাসের দাম। এসব খাতে ব্যবহূত প্রতি ইউনিট গ্যাসের দাম ৫-৬ টাকা পর্যন্ত বাড়তে পারে।

জানতে চাইলে বিইআরসির সদস্য (গ্যাস) মো. আব্দুল আজিজ খান বণিক বার্তাকে বলেন, ভোক্তাদের দাবি ও গণশুনানি-পরবর্তী বিতরণ কোম্পানিগুলোর তথ্যাদি আমরা বিশ্লেষণ করছি। মূল্যহার নিয়ে কাজ চলছে। আশা করছি, এ মাসের মধ্যেই নতুন মূল্যহার ঘোষণা হবে।

সর্বশেষ ২০১৭ সালের মার্চ ও জুনে দুই দফায় গ্যাসের দাম ২২ শতাংশ বাড়ায় বিইআরসি। সে সময় সবচেয়ে বেশি বাড়ানো হয় আবাসিক ও শিল্পে ব্যবহূত গ্যাসের দাম। এ দুই খাতে গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছিল প্রায় ৫১ শতাংশ। এবার আবাসিকে গ্যাসের দামে পরিবর্তন না এলেও বাড়ানো হচ্ছে শিল্প খাতে।

বিইআরসি সূত্রে জানা যায়, শিল্পে ব্যবহূত প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম বিদ্যমান ৭ টাকা ৭৬ পয়সা থেকে বেড়ে ১৩ টাকা হতে পারে। এছাড়া বিদ্যুতে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ৩ টাকা ১৬ পয়সা থেকে বেড়ে ৭ টাকা ও সার কারখানায় ২ টাকা ৭১ পয়সা থেকে বেড়ে হতে পারে ৬ টাকা।

শিল্পে নতুন করে গ্যাসের দাম বাড়লে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে জানান বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) প্রেসিডেন্ট মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ব্যবসায়ীদের দাবি আমলে না নিয়ে প্রায় প্রতি বছরই গ্যাসের দাম বাড়ানো হচ্ছে। মূল্যবৃদ্ধির আগে গণশুনানির যে আয়োজন, তা কেবল নিয়ম রক্ষার জন্য। মূল্যহারে ব্যবসায়ীদের মতামতের প্রতিফলন হয় না। ব্যবসায়ীরা জ্বালানির দাম নিয়ে প্রায় অসহায়।

সর্বশেষ আদেশে বাণিজ্যিকে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ১১ টাকা ৩৬ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১৭ টাকা ৪ পয়সা করা হয়। আবাসিকে এক চুলার ক্ষেত্রে ৬০০ থেকে বাড়িয়ে ৭৫০ ও দুই চুলার ক্ষেত্রে ৬৫০ টাকার স্থলে ৮০০ টাকা করা হয়। এ দুই ক্ষেত্রেই গ্যাসের দাম এ দফায় বাড়ছে না। গণশুনানিতেও বিষয়টি আসেনি।

নতুন কূপ আবিষ্কার ও উৎপাদন না হওয়ায় দেশে গ্যাস সংকট প্রকট আকার ধারণ করছে। দৈনিক ৪১২ কোটি ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে ২৮০ কোটি ঘনফুট। এ হিসাবে ঘাটতি থাকছে ১৩২ কোটি ঘনফুটের। জ্বালানি সংকট সমাধানে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করছে সরকার। এরই মধ্যে কক্সবাজারের মহেশখালীতে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ ও ব্যবহারের প্রস্তুতি শেষ হয়েছে। দুই মাস আগে জাতীয় গ্রিডে এ গ্যাস যোগ হওয়ার কথা থাকলেও সাব-সি পাইপলাইনে ছিদ্র ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সঞ্চালন লাইন নির্মাণকাজের জটিলতায় এলএনজির সঞ্চালন হচ্ছে না। দেশীয় গ্যাসের সঙ্গে এলএনজি যোগ হওয়ার পর মিশ্রিত গ্যাসের দাম দাঁড়াবে ইউনিটপ্রতি প্রায় ১৩ টাকা।

বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই গ্যাসের দাম বাড়ানোর জন্য বিইআরসির কাছে প্রস্তাব দেয় সঞ্চালন কোম্পানিসহ ছয়টি বিতরণ কোম্পানি। প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম গড়ে ৭৫ শতাংশ বৃদ্ধির প্রস্তাব করে তারা।

নিয়ম অনুযায়ী ভোক্তা, ব্যবসায়িক প্রতিনিধি এবং অন্যান্য নাগরিক প্রতিনিধির উপস্থিতিতে বিতরণ কোম্পানির প্রস্তাবের ওপর গণশুনানির আয়োজন করে বিইআরসি। ১১ থেকে ২১ জুন পর্যন্ত পৃথক কর্মদিবসে এ শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানিতে এলএনজি পরিবহন ও সঞ্চালন বাবদ ট্যারিফ বৃদ্ধির দাবি জানায়। কমিশনের কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি নতুন সম্পদ যোগ ও পরিবহন বাবদ গ্যাস সঞ্চালন কোম্পানি জিটিসিএলের মার্জিন ১০ পয়সা বৃদ্ধির প্রস্তাব করে। তবে গ্যাসের মূল্যহার ও নিজেদের বিতরণ মার্জিন বৃদ্ধির পক্ষে যৌক্তিক কারণ দেখাতে পারেনি বিতরণ কোম্পানিগুলো। অনেক বিতরণ কোম্পানি চাহিদার চেয়ে বেশি মার্জিন পাচ্ছে বলেও বিইআরসির মূল্যায়ন কমিটির প্রতিবেদনে উঠে আসে।

তবে সরকারের দেয়া ৫০ কোটি ঘনফুটের স্থলে ৪৬ কোটি ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ ধরে নতুন মূল্যহার নির্ধারণ করতে যাচ্ছে বিইআরসি। যদিও আনোয়ারা থেকে ফৌজদারহাট পর্যন্ত অসম্পন্ন লাইনের কারণে ৩০-৩৫ কোটি ঘনফুটের বেশি এলএনজি সঞ্চালন সম্ভব নয় বলে জানিয়েছে জিটিসিএল। নিয়ম অনুযায়ী গণশুনানি-পরবর্তী ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে নতুন মূল্যহার ঘোষণা দেয়ার কথা বিইআরসির। তবে এলএনজি যোগ হতে যাওয়ায় এ বছর বেশ দ্রুতই নতুন মূল্যহার ঘোষণা করছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. শামসুল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, গণশুনানিতে আমরা ভোক্তা পর্যায়ে মূল্যবৃদ্ধির বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছি। দাম না বাড়িয়ে যে এলএনজি আমদানির ব্যয়ও সংকুলান করা যায়, তার সপক্ষেও আমরা যুক্তি তুলে ধরেছি। এর পরও দাম বাড়ালে তা আইনসিদ্ধ হবে না।

এই বিভাগের আরও খবর