ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে পারবে সৌদি?
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সৌদি আরবের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি (১২৩ এগ্রিমেন্ট) আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন করেছেন। একাধিক মার্কিন প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
এই চুক্তির মাধ্যমে সৌদি আরবের উদীয়মান বেসামরিক পারমাণবিক শিল্পে মার্কিন কোম্পানিগুলোর নেতৃত্ব নিশ্চিত করা হবে। একই সঙ্গে অন্যান্য বিদেশি প্রতিযোগীদের বাইরে রাখা হবে। ধারণা করা হচ্ছে, বুধবারের মধ্যেই চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে কংগ্রেসে জমা দেওয়া হবে।
মার্কিন জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইট এবং সৌদি জ্বালানি মন্ত্রী প্রিন্স আবদুলআজিজ বিন সালমান চুক্তিতে স্বাক্ষর করবেন। তারা এর আগে রিয়াদে একটি প্রাথমিক সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছিলেন। ১৯৫৪ সালের মার্কিন অ্যাটমিক এনার্জি অ্যাক্টের ১২৩ ধারার অধীনে এই চুক্তি ছাড়া মার্কিন সরকার বা কোম্পানিগুলো সৌদি আরবের পারমাণবিক কর্মসূচিতে অংশ নিতে পারে না।
৩০ বছরের চুক্তি, মূল্য কয়েক দশ বিলিয়ন ডলার
চুক্তিটির সম্ভাব্য মূল্য কয়েক বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং এর মেয়াদ হবে ৩০ বছর। এর ফলে ওয়েস্টিংহাউসসহ মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো সৌদি আরবের পারমাণবিক অবকাঠামো নির্মাণে প্রধান ভূমিকা পালন করবে। এতে মার্কিন পারমাণবিক শিল্পে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ব্যবসার সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে কর্মকর্তারা আশা করছেন।
ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সুযোগ নিয়ে উদ্বেগ
চুক্তির সবচেয়ে বিতর্কিত দিক হলো, এতে যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’ নিরাপত্তা শর্ত অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এই শর্ত থাকলে সৌদি আরব নিজস্বভাবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বা ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করতে পারত না।
এছাড়া আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) এর এডিশনাল প্রোটোকল-ও এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। যা থাকলে সংস্থাটি ঘোষণাবহির্ভূত স্থাপনায় আকস্মিক পরিদর্শনের মতো আরও বিস্তৃত তদারকির সুযোগ পেত।
একটি সূত্র জানিয়েছে, চুক্তিটি পুরো পারমাণবিক জ্বালানি চক্রে—বিশেষ করে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে—সহযোগিতার আইনি পথ তৈরি করছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র সৌদিকে এ সংক্রান্ত প্রযুক্তি হস্তান্তর করতে বাধ্য থাকবে না। যৌথ অর্থনৈতিক সমীক্ষার পর সৌদি আরব নিজস্ব ভূখণ্ডে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র নির্মাণের অনুমতি পেতে পারে।
সৌদির অবস্থান
সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান বহুবার বলেছেন, ইরান যদি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করে, তবে সৌদি আরবও একই পথ অনুসরণ করবে।
২০১৮ সালে সিবিএসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, সৌদি আরব পারমাণবিক বোমা চায় না। কিন্তু ইরান যদি পারমাণবিক বোমা তৈরি করে, তাহলে আমরাও যত দ্রুত সম্ভব একই কাজ করব।
সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরেই নিজস্বভাবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার সংরক্ষণের দাবি জানিয়ে আসছে।
অস্ত্র বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ
অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ বিশেষজ্ঞ, পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তাররোধে কাজ করা গবেষক এবং মার্কিন কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাট ও কিছু রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা এই চুক্তি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
তাদের মতে, শক্তিশালী নিরাপত্তা শর্ত ছাড়া এই চুক্তি ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির ঝুঁকি বাড়াতে পারে। ইসরাইলও এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের আশঙ্কা, বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচি ভবিষ্যতে সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হতে পারে।
আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট
এ ঘোষণা এমন সময় এসেছে যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা দুর্বল করার লক্ষ্যে সামরিক অভিযান চালাচ্ছে। যদিও ইরান দাবি করে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ।
এছাড়া সম্প্রতি সৌদি আরবের সঙ্গে পারমাণবিক শক্তিধর পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, প্রয়োজন হলে পাকিস্তানের পারমাণবিক সক্ষমতা সৌদি আরবের জন্য ব্যবহারযোগ্য হতে পারে।
কংগ্রেসে পর্যালোচনা
চুক্তিটি কংগ্রেসে জমা দেওয়ার পর ৯০ দিনের পর্যালোচনা প্রক্রিয়া শুরু হবে। কংগ্রেস যৌথ প্রস্তাবের মাধ্যমে এটি আটকে দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। তবে প্রেসিডেন্ট ভেটো দিলে তা অকার্যকর করতে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রয়োজন হবে।
হোয়াইট হাউস, মার্কিন জ্বালানি বিভাগ এবং সৌদি সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করা হয়নি।

