img

শুধু গোল করা নয়, ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেন। প্রতিপক্ষের আত্মবিশ্বাস ভেঙে দেন। মাঠে নামলেই গোল যেন তার স্বাভাবিক অভ্যাস। আধুনিক ফুটবলে বিরল এক নাম আর্লিং ব্রট হালান্ড।

২৫ বছর বয়সেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন বিশ্বের সেরা ‘নাম্বার নাইন’ হিসেবে। শক্তিতে বক্সার, গতিতে স্প্রিন্টার আর গোলের সামনে নির্মম এক শিকারি। প্রতিপক্ষের সামান্য ভুলকেও গোলে পরিণত করতে জানেন।

বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচে ব্রাজিলের বিপক্ষে হালান্ড নিজের ক্যারিয়ারের আরেকটি অমর অধ্যায় লিখলেন। ম্যাচের ৭৯ মিনিটে বজ্রগতির আক্রমণ শেষ করে নরওয়েকে এগিয়ে দেন তিনি। ব্রাজিল তখনও ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। যোগ করা সময়ে আবারও হালান্ড। নিখুঁত ফিনিশিংয়ে জোড়া গোল করে নিশ্চিত করেন নরওয়ের ২-১ ব্যবধানের ঐতিহাসিক জয়। 

শেষ মুহূর্তে নেইমারের পেনাল্টি গোল শুধু ব্যবধান কমায়, ব্রাজিলকে বাঁচাতে পারেনি। বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয় পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা, আর ইতিহাস গড়ে প্রথমবারের মতো কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে নরওয়ে। বিশ্বকাপে হালান্ডের সবচেয়ে বড় ঘোষণা, শুধু ক্লাব ফুটবলের নয়, বিশ্বমঞ্চেরও রাজা হতে এসেছেন।

২০০০ সালের ২১ জুলাই ইংল্যান্ডের লিডসে জন্ম হালান্ডের। তার বাবা আলফ-ইঙ্গে হালান্ড খেলতেন লিডস ইউনাইটেডে। জন্ম ইংল্যান্ডে হলেও তিন বছর বয়সে পরিবার ফিরে যায় নরওয়ের ছোট্ট শহর ব্রিনেতে। সেখানেই বেড়ে ওঠা। 

ছোটবেলায় ফুটবলের পাশাপাশি হ্যান্ডবল, গলফ ও অ্যাথলেটিক্সেও সমান আগ্রহ ছিল। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে স্ট্যান্ডিং লং জাম্পে বয়সভিত্তিক বিশ্বসেরা দূরত্ব লাফানোর গল্প এখনও নরওয়েতে কিংবদন্তির মতো শোনা যায়। সেই বিস্ফোরণধর্মী শক্তির প্রতিফলনই আজ দেখা যায় তার দৌড়, লাফ আর হেডে।

স্থানীয় ক্লাব ব্রিনে এফকের একাডেমিতে ফুটবলের হাতেখড়ি। ২০১৬ সালে মাত্র ১৫ বছর বয়সে পেশাদার অভিষেক। প্রথমে উইঙ্গার হিসেবে খেললেও পরে কোচ তাকে সেন্টার ফরোয়ার্ডে নিয়ে আসেন। সেখান থেকেই শুরু গোলের অমিত ক্ষুধা। ২০১৭ সালে যোগ দেন মোলদেতে, যেখানে কিংবদন্তি ওলে গুনার সুলশায়ারের অধীনে নিজেকে আরও পরিণত করেন। ২০১৮ সালে এক ম্যাচে প্রথম ২১ মিনিটেই চার গোল করে ইউরোপের বড় ক্লাবগুলোর নজরে চলে আসেন।

২০১৯ সালে অস্ট্রিয়ার রেড বুল সালজবুর্গে গিয়ে নৈপুণ্যের ঝিলিক দেখান। চ্যাম্পিয়ন্স লিগ অভিষেকেই হ্যাটট্রিক, প্রথম পাঁচ ম্যাচেই গোল করে গড়েন নতুন ইতিহাস। এরপর বরুশিয়া ডর্টমুন্ডে যোগ দিয়ে ৮৯ ম্যাচে ৮৬ গোল করেন।

২০২২ সালে ম্যানচেস্টার সিটিতে যোগ দেওয়ার পর গোলের নতুন অভিধান লিখতে শুরু করেন। অভিষেক মৌসুমেই প্রিমিয়ার লিগে রেকর্ড ৩৬ গোল এবং সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৫২ গোল করে ভেঙে দেন বহু বছরের রেকর্ড। সেবার সিটি জেতে প্রিমিয়ার লিগ, এফএ কাপ ও চ্যাম্পিয়ন্স লিগ—ঐতিহাসিক ট্রেবল।

একই মৌসুমে জেতেন প্রিমিয়ার লিগ গোল্ডেন বুট, ইউরোপিয়ান গোল্ডেন শু, প্রিমিয়ার লিগ প্লেয়ার অব দ্য সিজন, ইয়াং প্লেয়ার অব দ্য সিজন এবং উয়েফা বর্ষসেরা ফুটবলারের পুরস্কার। ২০২৩ সালের ব্যালন ডি’অরে রানার্সআপ হন, জেতেন গার্ড মুলার ট্রফিও।

পরের দুই মৌসুমেও গোলের ধারাবাহিকতা ধরে রেখে আরও দুটি প্রিমিয়ার লিগ গোল্ডেন বুট জেতেন। প্রিমিয়ার লিগে দ্রুততম ৫০ গোল, সিটির হয়ে দ্রুততম ১০০ গোল, চ্যাম্পিয়ন্স লিগে সর্বোচ্চ মিনিট-প্রতি গোলের রেকর্ডসহ অসংখ্য মাইলফলক নিজের করে নিয়েছেন। সিটির হয়ে ১৫০টির বেশি গোল এবং ক্যারিয়ারে তিনশ’র কাছাকাছি গোল তাকে ইতোমধ্যেই আধুনিক যুগের অন্যতম সেরা গোলদাতার আসনে বসিয়েছে।

জাতীয় দলের হয়েও তিনি সমান দুর্দান্ত। ২০১৯ অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপে হন্ডুরাসের বিপক্ষে এক ম্যাচে ৯ গোল করে গড়েন অবিশ্বাস্য রেকর্ড এবং জেতেন গোল্ডেন বুট। ২০২৪ সালে প্রথমবার নরওয়ের অধিনায়কত্ব করে স্লোভেনিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল করে দেশের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হন। গত বছর বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে আট ম্যাচে ১৬ গোল করে নরওয়েকে ২৮ বছর পর বিশ্বকাপে ফেরান। ইতালির বিপক্ষে সান সিরোতে জোড়া গোল করে ৪-১ জয়ের ম্যাচটি নরওয়ের ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় রাত হয়ে আছে।

শুধু গোলই নয়, বিশ্বকাপে হালান্ডের পারফরম্যান্সও মুগ্ধ করেছে ফুটবলবিশ্বকে। প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের ব্যস্ত রাখা, আকাশে আধিপত্য, দ্রুতগতির কাউন্টার অ্যাটাকে নেতৃত্ব দেওয়া এবং সংকটের মুহূর্তে দলকে সামনে থেকে টেনে নেওয়ার ক্ষমতা তাকে নরওয়ের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ২৮ বছর পর বিশ্বকাপে ফেরা নরওয়ে এখন শিরোপার স্বপ্ন দেখছে, আর সেই স্বপ্নের সবচেয়ে বড় কারিগর আর্লিং ব্রট হালান্ড।

হালান্ডের অর্জনের তালিকা বিস্ময়কর। উয়েফা বর্ষসেরা ফুটবলার, আইএফএফএইচএস বিশ্বের সেরা ফুটবলার, তিনবার প্রিমিয়ার লিগ গোল্ডেন বুট, ইউরোপিয়ান গোল্ডেন শু, গার্ড মুলার ট্রফি, গোল্ডেন বয়, বুন্দেসলিগা সিজনের সেরা খেলোয়াড়, দুইবার চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতা, একাধিকবার ফিফা ফিফপ্রো ওয়ার্ল্ড একাদশে জায়গা এবং নরওয়ের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার স্বীকৃতি এখন তার নামের পাশে।

মাঠের বাইরে হালান্ডের জীবনও ব্যতিক্রম। দীর্ঘদিনের সঙ্গী ইসাবেল হাউগসেং ইয়োহানসেন এবং তাদের সন্তানকে নিয়ে ব্যক্তিগত জীবন আড়ালেই রাখতে পছন্দ করেন। কঠোর খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত ঘুম এবং শারীরিক ফিটনেসের প্রতি অসাধারণ মনোযোগই তার সাফল্যের অন্যতম রহস্য। নাইকি, ডলচে অ্যান্ড গাব্বানা, ব্রাইটলিং, হাইপারআইস, ইএ স্পোর্টস, ভায়াপ্লের মতো বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডের সঙ্গে রয়েছে তার চুক্তি।

যে ছেলেটি একদিন ব্রিনের ছোট্ট মাঠে গোলের পর গোল করত, সেই ছেলেই আজ বিশ্বকাপের সবচেয়ে আলোচিত নায়ক। রেকর্ডের পর রেকর্ড গড়ে চলা এই ভাইকিং স্ট্রাইকারের চোখ এখন আরও বড় স্বপ্ন। বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফি হাতে তুলে নেওয়া। বর্তমান ফুটবল যদি কোনো নতুন মহাতারকার সন্ধান পেয়ে থাকে, তার নাম নিঃসন্দেহে আর্লিং ব্রট হালান্ড।

এই বিভাগের আরও খবর