img

ভারতের রাজনীতিতে ইন্দিরা গান্ধী ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দুই সময়ের সবচেয়ে প্রভাবশালী নারী নেতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দুজনের রাজনৈতিক জীবনে যেমন উত্থানের গল্প রয়েছে, তেমনি রয়েছে বড় ধরনের সংকটও। তবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সামনে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তার সঙ্গে ইন্দিরা গান্ধীর অতীতের রাজনৈতিক সংকটের তুলনা শুরু হয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, ইন্দিরা গান্ধী দল ভেঙে যাওয়া, দল থেকে বহিষ্কার হওয়া এবং নির্বাচনে বড় পরাজয়ের পরও ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সামনে সেই পথ অনেক বেশি কঠিন। 

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক নির্বাচনের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজনৈতিকভাবে বড় ধাক্কা খেয়েছেন। দলের অনেক শীর্ষ নেতা, জনপ্রতিনিধি এবং সংগঠনের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা আগের অবস্থানে নেই। যাদের দীর্ঘদিন নিজের রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন, তাদের অনেকেই এখন ভিন্ন অবস্থানে চলে গেছেন। ফলে দলের ভেতরেও আগের মতো ঐক্য দেখা যাচ্ছে না। 

ইতিহাস বলছে, ১৯৬৯ সালে কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ বিরোধের জেরে ইন্দিরা গান্ধী দল থেকে বহিষ্কৃত হন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কংগ্রেসের সিন্ডিকেট নেতৃত্বের সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব চরমে পৌঁছায়। পরে তিনি আলাদা দল গঠন করেন এবং সাধারণ মানুষের সমর্থন নিয়ে ১৯৭১ সালের নির্বাচনে বড় জয় পান। 

পরবর্তীকালে জরুরি অবস্থার পর ১৯৬৯ সালের নির্বাচনে কংগ্রেসের ভরাডুবি ঘটে। এরপর আবারও দলীয় সংকট দেখা দিলেও ইন্দিরা গান্ধী নতুন দল গঠন করে ১৯৮০’র নির্বাচনে পুনরায় ক্ষমতায় ফেরেন। 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইন্দিরার সাফল্যের পেছনে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। তার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, দুর্নীতির সরাসরি অভিযোগ না থাকা, সাধারণ মানুষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ এবং রাজনৈতিক ভুলের পর জনসমক্ষে আত্মসমালোচনার মানসিকতা তাকে আবারও জনগণের আস্থা ফিরিয়ে দিতে সহায়তা করেছিল।

অন্যদিকে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। তাদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে তৃণমূল কংগ্রেসের বিভিন্ন নেতার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ, সম্পদের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং প্রশাসনিক নানা বিতর্ক দলের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। যদিও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এখনো প্রমাণিত হয়নি, তবুও দলের ভাবমূর্তি নিয়ে প্রশ্ন ক্রমেই বেড়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এক সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সাদামাটা জীবনযাপন ও সততার প্রতীক হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই ভাবমূর্তি আগের মতো শক্ত অবস্থানে নেই। আরও একটি বড় পার্থক্যের কথা তুলে ধরছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। ইন্দিরা গান্ধীর পেছনে ছিল কংগ্রেসের দীর্ঘ রাজনৈতিক ঐতিহ্য এবং নেহরু পরিবারের উত্তরাধিকার। সেই ঐতিহাসিক ভিত্তি তাকে সংকটের সময়ও বড় রাজনৈতিক শক্তি জুগিয়েছিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রে তেমন কোনো ঐতিহাসিক বা আদর্শিক উত্তরাধিকার নেই বলে তাদের মত।

একই সঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসে নেতৃত্বের কেন্দ্রীকরণ নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন অনেকে। তাদের মতে, দলটি দীর্ঘদিন ধরে মূলত একজন নেতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। ফলে নেতৃত্ব দুর্বল হলে পুরো সংগঠনও সংকটে পড়ে। 

বিশ্লেষকদের আরেকটি পর্যবেক্ষণ হলো, নির্বাচনী পরাজয় মেনে নিয়ে আত্মসমালোচনার যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি অনেক সময় নেতাদের নতুনভাবে সংগঠিত হতে সাহায্য করে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখনো সেই পথে হাঁটছেন না। বরং নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। 

তবে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করিয়ে দিচ্ছেন, রাজনীতিতে কোনো নেতার প্রতিপত্তি খুব দ্রুত শেষ বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। কারণ অতীতেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একাধিকবার কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করে রাজনীতিতে শক্ত অবস্থানে ফিরেছেন। তাদের মতে, সাম্প্রতিক নির্বাচনেও তৃণমূল কংগ্রেস উল্লেখযোগ্য ভোট পেয়েছে। ফলে দলের একটি বড় ভোটভিত্তি এখনো রয়ে গেছে। 

ভবিষ্যতে রাজনৈতিক পরিস্থিতি, জনমত এবং দলের সাংগঠনিক পরিবর্তনের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করবে। তাই ইন্দিরা গান্ধীর মতো আরেকটি ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তনের গল্প মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় লিখতে পারবেন কি না, তার উত্তর এখনই দেওয়া সম্ভব নয়।

এই বিভাগের আরও খবর