img

বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের জন্য এ বছর ৭১ দশমিক শূন্য পাঁচ কোটি ডলার সহায়তার আহ্বান জানানো হয়েছে। খাদ্যনিরাপত্তা, সুরক্ষা, শিক্ষাসহ আটটি খাতে কক্সবাজার ও ভাষানচরে অবস্থানরত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী এবং টেকনাফের স্থানীয় বাসিন্দা মিলিয়ে মোট ১৫ লাখ মানুষের সহায়তায় এই তহবিল চাওয়া হয়েছে।

বুধবার (২০ মে) ঢাকার জাতিসংঘ ভবনে তহবিলের হালনাগাদ তথ্য তুলে ধরে এই আহ্বান জানানো হয়। বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে নিবিড় সমন্বয়ের মাধ্যমে জাতিসংঘ এবং এর অংশীদাররা জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যানের (জেআরপি) আওতায় এই সহায়তার আহ্বান জানায়।  

অনুষ্ঠানে হালনাগাদ তথ্য উপস্থাপন করেন ইউএনএইচসিআর’র কেলি ক্লেমেন্টস, ডব্লিউএফপি’র রানিয়া দাগাশ-কামারা, ইউএন উইমেন’র নিয়ারাদজাই গুম্বনজভান্দা, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আন্তঃসরকারি সংস্থা বিষয়ক সচিব ও ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্র সচিব এম. ফরহাদুল ইসলাম এবং জাতিসংঘের অন্তর্বর্তীকালীন আবাসিক সমন্বয়কারী ক্যারল ফ্লোর। ৫২টি বাংলাদেশি সংস্থাসহ ৯৮টি মানবিক অংশীদার এই সহায়তার আবেদনে সমর্থন জানিয়েছে।

সহায়তার এই আহ্বান এমন সময়ে জানানো হলো যখন কি না গোটা বিশ্ব ক্রমবর্ধমান অস্থিতিশীলতা এবং মানবিক চাপের মধ্যে রয়েছে। এই পরিস্থিতির কারণে অগ্রাধিকার নির্ধারণ কঠিন হয়ে পড়েছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য জরুরি পরিষেবাগুলো আজ হুমকির মুখে। এমন সময়েও বাংলাদেশ উদারভাবে শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়া অব্যাহত রেখেছে। তাই বাংলাদেশের এই পদক্ষেপে জোর দিতে আন্তর্জাতিক সহায়তা অব্যাহত রাখা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। 

চার দিনের একটি যৌথ উচ্চপর্যায়ের দাতাদের আলোচনার পর এই আবেদন জানানো হয়। কেলি টি. ক্লেমেন্টস এবং রানিয়া দাগাশ-কামারার নেতৃত্বে এই মিশনে প্রধান আন্তর্জাতিক দাতা প্রতিনিধিদের একটি দল একত্রিত হয়। এই মিশনের অংশ হিসেবে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও স্থানীয় জনগোষ্ঠী পরিদর্শনের জন্য দু’দিনের একটি সফর ছিল, যেখানে মূল অংশীদার হিসেবে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, সুইডেন এবং যুক্তরাজ্য অংশ নেয়। প্রতিনিধি দলটি কক্সবাজার ও ঢাকায় সরকার, জাতিসংঘ ও এনজিও অংশীদারদের পাশাপাশি বৃহত্তর দাতা সম্প্রদায়ের সঙ্গেও মতবিনিময় করেছে।

মানবিক সম্প্রদায় আবারও জোর দিয়ে বলছে যে রোহিঙ্গা সংকটের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত ও টেকসই সমাধান হলো স্বেচ্ছায়, নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন। সেখানকার পরিস্থিতি অনুকূল না হওয়া পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সংহতি ও সহায়তা অব্যাহত রাখা অপরিহার্য। এটি কেবল মানবিক দায়িত্বই নয়, বরং মানবাধিকার রক্ষা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং শরণার্থী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠী যেন অবহেলিত না হয় তা নিশ্চিতের জন্যও জরুরি।

বর্তমানে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে রয়েছে এবং তাদের চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে। ২০২৪ সালের শুরু থেকে নতুন করে প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন। এর ফলে সীমিত মানবিক সম্পদের ওপর চাপ পড়ার পাশাপাশি জনাকীর্ণ ক্যাম্পগুলোতেও চাপ তীব্র হয়েছে।

জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর বলছে, রোহিঙ্গা মানবিক সংকটের জন্য জেআরপি ২০২৬ সালের হালনাগাদ পরিকল্পনাটি অত্যন্ত অগ্রাধিকারভিত্তিক এবং সীমিত পরিসরের। এর মাধ্যমে শরণার্থী এবং বাংলাদেশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীসহ প্রায় ১৫ দশমিক ছয় লাখ মানুষের কাছে সহায়তা পৌঁছানো হবে। 

সংস্থাটি আরও বলছে, ৭১ দশমিক শূন্য পাঁচ কোটি ডলারের এই আবেদনটি ২০২৫ সালের তুলনায় ২৬ শতাংশ কম, এটি জীবন রক্ষাকারী সহায়তা বজায়ের জন্য শুধুমাত্র ন্যূনতম প্রয়োজনটুকু মেটাবে। এর মধ্যে খাদ্যের জন্য ২৪ দশমিক ৭৩ কোটি, বাসস্থানের জন্য ১২ দশমিক আট কোটি, পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধির জন্য ছয় দশমিক ১২ কোটি, শিক্ষার জন্য পাঁচ দশমিক ২৭ কোটি, স্বাস্থ্যের জন্য চার দশমিক ৯৯ কোটি এবং জীবিকা ও দক্ষতা উন্নয়নের জন্য তিন দশমিক ৫১ কোটি মার্কিন ডলার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এছাড়াও, এই সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সহায়তায় সব খাত মিলিয়ে তিন দশমিক ৬২ কোটি মার্কিন ডলার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

২০১৭ সাল থেকে ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় রোহিঙ্গা সংকটে প্রায় পাঁচ দশমিক ৪২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মানবিক সহায়তা করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় দাতা যুক্তরাষ্ট্র।

ইউএনএইচসিআর ডেপুটি হাই কমিশনার কেলি টি. ক্লেমেন্টস বলেন, যেহেতু সম্পদ সীমিত হয়ে আসছে, তাই শরণার্থীদের দক্ষতা ও সহনশীলতা বৃদ্ধি করে তাদের স্বনির্ভর করতে হবে। যাতে তারা নিজেদের জীবন নতুন করে গড়তে পারে।

তিনি বলেন, রোহিঙ্গারা নিরাপদে নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তাদের নিরাপত্তা, যত্ন এবং মর্যাদা দেওয়া আমাদের অব্যাহত রাখতে হবে। সম্পদ ক্রমাগত কমে যাওয়ার এই সময়ে মানবিক সম্প্রদায় যতটা সম্ভব দক্ষতার সঙ্গে কঠোর পরিশ্রম করে যাচ্ছে। কিন্তু, চাহিদা এখনও বিশাল এবং তহবিল হ্রাসের কারণে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের ওপর এর যে প্রভাব পড়ছে, তা কেবল দক্ষতা দিয়ে মেটানো সম্ভব নয়। শরণার্থী সম্প্রদায়কে আরও বেশি স্বনির্ভর হতে সাহায্য করা আমাদের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। 

ডব্লিউএফপি’র পার্টনারশিপ অ্যান্ড ইনোভেশন বিষয়ক অ্যাসিস্ট্যান্ট এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর রানিয়া দাগাশ-কামারা বলেন, এই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অসাধারণ উদারতা দেখিয়েছে। আমরা আমাদের দাতাদের কাছে গভীরভাবে কৃতজ্ঞ, যারা এই কার্যক্রমে যুক্ত রয়েছেন। তাদের অব্যাহত সহায়তা শরণার্থীদের জন্য একটি জীবনরেখা হিসেবে কাজ করছে।

তিনি বলেন, ক্যাম্পের প্রকৃত এবং পরিবর্তনশীল চাহিদার ওপর ভিত্তি করে ডব্লিউএফপি সমতা, দক্ষতা এবং কার্যকরভাবে সহায়তা নিশ্চিতে কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু, মানবিক সহায়তাই চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়। রোহিঙ্গা শরণার্থীরা যেন নিরাপদ, স্বেচ্ছায় এবং মর্যাদার সঙ্গে নিজ দেশে ফিরতে পারে আমাদের অবশ্যই এই পরিস্থিতি তৈরিতে সহায়তা অব্যাহত রাখতে হবে।

ইউএন উইমেন’র ডেপুটি এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর নিয়ারাদজাই গুম্বনজভান্দা বলেন, রোহিঙ্গা শরণার্থী বিশেষ করে নারী ও মেয়েদের চাহিদা এখনও বিশাল। তহবিল হ্রাসের প্রভাব ইতোমধ্যে ক্যাম্পের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই অনুভূত হচ্ছে। বাস্তুচ্যুতির বৃহত্তর চ্যালেঞ্জের মধ্যে নারী ও মেয়েরা আরও বেশি ঝুঁকি এবং বাধার সম্মুখীন হয়, যার জন্য টেকসই মনোযোগ প্রয়োজন।

এই বিভাগের আরও খবর


সর্বশেষ