img

ভারতের অন্যান্য রাজ্যে সিনেমা ও রাজনীতি মাঝে মধ্যে একে অপরের পরিপূরক হলেও তামিলনাড়ুতে এ দুটি ক্ষেত্র গত পাঁচ দশক ধরে একই সূত্রে গাঁথা। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল সেই পরম্পরাকেই আরও একবার জোরালোভাবে প্রমাণ করল। 

দক্ষিণ ভারতের রুপালি পর্দার জগত থেকে রাজনীতির ময়দানে নাম লেখানো সুপারস্টার থালাপতি বিজয়ের নবগঠিত দল ‘তামিলাগা ভেট্টি কাজাগাম’ (টিভিকে) ১০৭টি আসন জিতে একক বৃহত্তম দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে, যা রাজ্যটির রাজনীতিতে এক নতুন যুগের সূচনা করল।

বিজয়ের ঐতিহাসিক বিজয় 

সেখানকার নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বিজয়ের দল ১০৭টি আসনে জয়লাভ করে সংখ্যাগরিষ্ঠতার (১১৮ আসন) খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। দীর্ঘ ৫০ বছর পর এই প্রথম দ্রাবিড় রাজনীতির দুই প্রধান শক্তি—ডিএমকে ও এআইএডিএমকে—কে পেছনে ফেলে কোনো নতুন শক্তি এভাবে মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে সক্ষম হলো। 

এ যাত্রায় বিজয় নিজে পেরাম্বুর ও তিরুচিরাপল্লি—উভয় কেন্দ্র থেকেই বিশাল ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন।অন্যদিকে বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্ট্যালিন নিজের দুর্গ হিসেবে পরিচিত কোলাথুর আসনে পরাজিত হয়ে বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন। 

সিনেমা থেকে রাজনীতি: বিজয়ের কাঁধে যে লিগ্যাসি 

তামিলনাড়ুর ভোটাররা বরাবরই সিনেমার আইকনদের রাজনৈতিক ভাগ্য নির্ধারণে বড় ভূমিকা রেখেছেন। বিজয়ের এই উত্থান মূলত এমজিআর এবং জয়ললিতার তৈরি করে যাওয়া পথেরই ধারাবাহিকতা।

এর আগে তামিলনাড়ুর দুই প্রভাবশালী রাজনীতিবদি সি এন আন্নাদুরাই এবং এম করুণানিধির মতো নেতারা সিনেমাকে আদর্শ প্রচারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। রাজনীতে আসার আগে এম করুণানিধি তামিল সিনেমার একজন সফল চিত্রনাট্যকার ছিলেন। চিত্রনাট্য ও সংলাপের মাধ্যমে তারা সামাজিক ন্যায়বিচার এবং তামিল জাতীয়তাবাদের ধারণা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। 

এমজিআর: রুপালি পর্দার ‘গরিবের রক্ষাকর্তা’ ভাবমূর্তি ব্যবহার করে এমজিআর ভারতের প্রথম অভিনেতা হিসেবে মুখ্যমন্ত্রী হন এবং টানা ১০ বছর শাসন করেন। তার ফ্যান ক্লাবগুলোই পরবর্তীতে শক্তিশালী রাজনৈতিক ক্যাডারে পরিণত হয়।

জয়লিতা: সেই একই পথে আগান তামিলনাড়ুর জনপ্রিয় অভিনেত্রী জয়ললিতাও। এমজিআরের যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন ‘আম্মা’ হিসেবে। সিনেমাটিক জনপ্রিয়তাকে তিনি অটুট রাজনৈতিক আস্থায় রূপান্তর করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনিও রাজ্যটির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। 

কেন বারবার সফল হন রুপালি পর্দার নায়করা? 

তামিলনাড়ুর ভোটারদের কাছে সিনেমা কেবল বিনোদন নয়, বরং সামাজিক বার্তার মাধ্যম। বিজয়ের ক্ষেত্রেও তার দরিদ্রবান্ধব এবং দুর্নীতিবিরোধী পর্দার ইমেজ বাস্তব রাজনীতির মাঠে ভোটারদের প্রবলভাবে আকৃষ্ট করেছে। এছাড়া বিজয়ের সুসংগঠিত ফ্যান ক্লাবগুলো নির্বাচনের মাঠে শক্তিশালী সাংগঠনিক শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। 

তামিলনাড়ুর মোট ২৩৪ আসনের মধ্যে বিজয়ের দল টিভিকে পেয়েছে ১০৭টি আসন, ডিএমকে-র আসন সংখ্যা ৫৯, এআইএডিএমকে ৪৭টি এবং অন্যান্যরা ২১টি আসন পেয়েছে। 

এমতাবস্থায় একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় বিজয় এখন জোট গঠনের দিকে নজর দিচ্ছেন। কংগ্রেস ও অন্যান্য ছোট দলগুলো ইতোমধ্যে তাকে সমর্থনের ইঙ্গিতও দিয়েছে। 

তামিলনাড়ুর ইতিহাসে এটি কেবল একটি ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং সিনেমার পর্দার নায়ককে বাস্তবের ত্রাণকর্তা হিসেবে গ্রহণ করার দীর্ঘদিনের আবেগের এক নতুন বহিঃপ্রকাশ।

এই বিভাগের আরও খবর