img

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত অবসানের পথে প্রধান অন্তরায় এখন আর কেবল পারমাণবিক কর্মসূচি বা ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা নয়, বরং এর মূলে রয়েছে ‘অর্থ’।

কূটনৈতিক বিশ্লেষক এবং কর্মকর্তাদের মতে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের অর্থনৈতিক যুদ্ধংদেহী নীতি এবং তেহরানকে আর্থিক সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে তার চরম অনিচ্ছাই বর্তমানে আলোচনার টেবিলে অচলাবস্থা তৈরি করেছে। 

ওয়াশিংটন ও মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের ওপর থেকে অর্থনৈতিক অবরোধ বা নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে চাচ্ছে না, যা মূলত কোনো সম্ভাব্য সমঝোতাকে ব্যর্থতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

ট্রাম্প দীর্ঘ এক দশক ধরে ইরানের বিরুদ্ধে আর্থিক ব্যবস্থাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে আসছেন। ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির সময় ইরানকে দেওয়া নগদ অর্থ বা ‘কার্গো ভর্তি ক্যাশ’ নিয়ে তিনি বরাবরই কঠোর সমালোচনা করেছেন। এখন পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে ওবামার আমলের সেই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করায় ট্রাম্প নিজে কোনো আর্থিক ছাড় দিতে পারছেন না। কারণ, সংঘাত শেষে যদি ইরান অর্থনৈতিকভাবে লাভবান অবস্থায় থাকে, তবে তা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য রাজনৈতিকভাবে চরম অস্বস্তিকর হয়ে দাঁড়াবে। 

মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট সম্প্রতি দাভোস অর্থনৈতিক ফোরামে দম্ভ করে বলেছিলেন যে নিষেধাজ্ঞার কারণেই ইরানের মুদ্রা রিয়ালের ব্যাপক পতন ঘটেছে এবং মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছে, যা কোনো গুলি না ছুড়েই এক বিশাল বিজয়।

অন্যদিকে, ইরানের নেতৃত্ব এখন চরম অর্থসংকটে রয়েছে। যদিও যুদ্ধের কারণে তেলের দাম বেড়ে ইরান কিছুটা লাভবান হয়েছে, কিন্তু ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলায় তাদের প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে। 

এই বিপুল ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে এবং দেশে কর্মসংস্থান তৈরি করতে ইরানের জন্য বড় অংকের নগদ অর্থ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ অত্যন্ত জরুরি। বিশ্লেষক অ্যালান আইয়ারের মতে, পারমাণবিক বিষয়টি এখন অনেকটা গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে; আসল বিষয় হলো ইরান কী পাবে। তেহরান বর্তমানে ক্ষতিপূরণ, হিমায়িত সম্পদ ফেরত এবং নিষেধাজ্ঞার অবসান চাইছে।

একটি সম্ভাব্য প্রস্তাব হিসেবে ‘হরমুজ প্রণালি’ দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজ থেকে টোল বা মাশুল আদায়ের বিষয়টি আলোচনায় এসেছিল। ইরান চায় এই মাশুল আদায়ের মাধ্যমে তাদের অর্থনীতি সচল রাখতে। তবে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে আন্তর্জাতিক জলপথে ইরানকে ‘দ্বাররক্ষক’ হিসেবে মেনে নেওয়া হবে না। 

এছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও কুয়েতের মতো প্রতিবেশীরাও ইরানের এই টোল আদায়ের প্রস্তাবের ঘোর বিরোধী। ইরান জানে যে তার প্রতিবেশীরা ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে বিকল্প পাইপলাইন তৈরির চেষ্টা করছে, তাই তারা স্থায়ী সমাধান হিসেবে সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার চায়।

পরিশেষে, ট্রাম্প যদি শেষ পর্যন্ত ইরানকে কোনো বড় ধরনের অর্থনৈতিক সুবিধা দেন, তবে তাকে দেশের ভেতরে এবং ইসরাইলের তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়তে হবে। ইসরাইল কোনোভাবেই ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পক্ষপাতি নয়। 

ট্রিতা পার্সি নামের এক বিশেষজ্ঞের মতে, এটি হতে যাচ্ছে ট্রাম্পের জন্য সবচেয়ে বড় লড়াই—যেখানে একদিকে থাকবে তার রাজনৈতিক ইমেজ এবং অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের অবসান। শেষ পর্যন্ত অর্থ ও রাজনীতির এই মারপ্যাঁচে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা কোন দিকে মোড় নেয়, তাই এখন দেখার বিষয়।

এই বিভাগের আরও খবর


সর্বশেষ