img

মুক্তিযোদ্ধা পরিবার জামায়াতে ইসলামের রাজনীতি করতেই পারে না বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির সংসদ সদস্য মু্ক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান। 

জামায়াত আমিরকে ইঙ্গিত করে মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্য হয়ে ‘জামায়াতে ইসলামী করা যায় না’ মন্তব্য করে জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের তীব্র প্রতিবাদের মুখে পড়েন কিশোরগঞ্জ ৪ আসনের এই সংসদ সদস্য। 

রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি বলেন, আমি আবারও বলে রাখলাম, শহীদ পরিবারের লোক তো জামায়াত করতেই পারে না। আর জামায়াত করলে ডাবল অপরাধ করতেছে।

মঙ্গলবার স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশনে ফজলুর রহমানের এই বক্তব্যের পর বিরোধী দলের সদস্যরা দাঁড়িয়ে হইচই শুরু করেন।

এক পর্যায়ে স্পিকারও দাঁড়িয়ে সদস্যদের বসতে বলেন এবং পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন।

বিএনপির সংসদ সদস্য ফজলুর রহমান তার বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধ, ৫ অগাস্টের অভ্যুত্থান, জামায়াতে ইসলামী, আল বদর, পুলিশ হত্যা, থানা লুট ও অস্ত্র লুটের প্রসঙ্গ তোলেন।

ফজলুর রহমান বলেন, বিরোধী দলের নেতাকে সবসময় আমি মাননীয় বলে কথা বলি কিন্তু ওনার দলের লোকজন এখানে বসে আছে তারা আমাকে ফজা পাগলা বলে কথা বলে, তারা নাকি সভ্য, তারা নাকি ইসলাম?

এ সময় স্পিকার বলেন, আপনাকে কেউ এই ধরনের উক্তি করেছে? আপনার সম্বন্ধে এরকম তো সংসদে কেউ বলে নাই।

ফজলুর রহমান বলেন, করেছে, করেছে, আছে এখানে।

রাষ্ট্রপতির ভাষণ নিয়ে নিজের ‘মিশ্র ধারণা’ আছে জানিয়ে ফজলুর রহমান বলেন, ভাষণে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আরও বিস্তারিতভাবে আসা উচিত ছিল।

তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মহাসমুদ্রের চেয়েও গভীর ইতিহাস।

৫ অগাস্টের আন্দোলনে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি বলেন, ওই আন্দোলনকে তিনি ‘ছোট করে’ দেখেন না। তবে ৫ অগাস্টকে ‘বিপ্লব’ বলতে তিনি রাজি নন।

এই মুক্তিযোদ্ধা বলেন, আগস্ট কোনো বিপ্লব নয়, আগস্ট হল গণঅভ্যুত্থান। সেই গণঅভ্যুত্থানকে যারা মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে তুলনা করতে চায়, জুলাই যুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধ, তাদেরকে আমি বলব, সবাইকে আমি বলব, এই কথাটা বলাই অন্যায়।

মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে ৫ আগস্টের তুলনাকে তিনি ‘প্রশান্ত মহাসাগরের সঙ্গে কুয়ার তুলনা’ এবং ‘হিমালয় পর্বতের সঙ্গে টিলার তুলনা’ করার মত বলে মন্তব্য করেন।

বক্তব্যে তিনি পাল বংশ, সেন শাসন, মোগল শাসন, পলাশীর যুদ্ধ, সন্ন্যাসী বিদ্রোহ, ক্ষুদিরাম, চিত্তরঞ্জন দাস, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, সুভাষচন্দ্র বসু, মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রসঙ্গ টেনে মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘ ঐতিহাসিক পটভূমি তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রাম একদিনে হয়নি। তার ভাষায়, “মুক্তিযুদ্ধ এত সহজ জিনিস না।”

ফজলুর রহমান তার বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধের ১১টি সেক্টরের কথাও তুলে ধরেন। সেক্টর কমান্ডারদের মধ্যে জিয়াউর রহমান, খালেদ মোশাররফ, কে এম শফিউল্লাহ, সি আর দত্ত, মীর শওকত আলী, এম কে বাশার, কাজী নূরুজ্জামান, এম এ মঞ্জুর, এম এ জলিল ও কর্নেল তাহেরের নাম স্মরণ করেন।

মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ভূমিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেটোর প্রসঙ্গও তোলেন তিনি।

ফজলুর রহমান বলেন, ভারত ১৯৭১ সনের ডিসেম্বর আমাদেরকে সহযোগিতা করার জন্য যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল এবং তার হাজার হাজার সৈন্য এই মাটিতে রক্ত দিয়ে গেছে।

২০২৪ সালের ৫ অগাস্টের পর সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত হয়েছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, একটা গান হইতে পারে নাই, একটা নাটক হইতে পারে নাই, একটা লালনের গীতি হইতে পারে নাই, একটা বাউল গান হইতে পারে নাই। সবকিছু কালো শক্তি ধ্বংস করে দিয়েছিল।

এরপর জামায়াতে ইসলামীকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, নির্বাচনে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে বলে প্রচার করা হচ্ছিল।

‘আমি হতভাগা ফজলুর রহমান বলেছিলাম, জামায়াত জোট যদি মেজরিটি পায়, তাহলে আমি বিষ খাব। এই কথাটা বলেছি, কথা সত্য। আমি বলে যাচ্ছি এবং তারা কোনোদিন যুদ্ধে জয় লাভ করতে পারে না, রাজনৈতিক যুদ্ধে। কারণ তাদের পূর্বপুরুষ বাংলাদেশ চায় নাই।’

তিনি বলেন, যতদিন রয়েল বেঙ্গল টাইগার থাকবে, মুক্তিযোদ্ধা জিতবে। রাজাকার কোনোদিন এদেশে জয় লাভ করতে পারবে না। আমি চ্যালেঞ্জ করে বলে গেলাম।’

পরে তিনি বলেন, বিরোধী দলের নেতা বলেছেন, উনি মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের লোক এবং উনি শহীদ পরিবারের লোক এবং উনি জামায়াতে ইসলামী করেন। এটা ডাবল অপরাধ। মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের লোক কেউ জামায়াত করতে পারে না।

তার এ বক্তব্যের সঙ্গে সঙ্গে বিরোধী দলের সদস্যরা দাঁড়িয়ে হইচই শুরু করেন।

স্পিকার বলেন, মাননীয় সদস্যবৃন্দ উনাকে বলতে দেন। মাননীয় সদস্যবৃন্দ অর্ডার অর্ডার। আপনারা শৃঙ্খলা রক্ষা করুন মাননীয় সদস্যবৃন্দ, সংসদের শৃঙ্খলা রক্ষা করুন।

বিরোধী দলের সদস্যরা আবারও ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলে স্পিকার ফজলুর রহমানকে অপেক্ষা করতে বলেন।

ফজলুর রহমান তখন বলেন, আমি কিন্তু উনাদেরকে খারাপ কিছু বলি নাই।

ফজলুর রহমানের বক্তব্যে বিরোধী দলের সদস্যরা দাঁড়িয়ে হইচই শুরু করলে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদও দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন।

তিনি বারবার সদস্যদের বসার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “মাননীয় সদস্যবৃন্দ, একটু মনোযোগ দিয়ে আমার কথাটি শোনার চেষ্টা করুন।”

এরপর স্পিকার বলেন, “এটি বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ। এখানে প্রত্যেকেই নির্বাচিত হয়ে এসেছেন।”

বিরোধী দলের নেতা শফিকুর রহমানকেও আগে তাকে কথা বলতে দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে স্পিকার বলেন, মাননীয় বিরোধী দলের নেতা, আমি বলি তারপর আপনি বলেন।

ফজলুর রহমানকেও বসতে বলে স্পিকার বলেন, মাননীয় সদস্য ফজলুর রহমান, আপনি বসেন। আপনাকে সুযোগ দেওয়া হবে বক্তব্য শেষ করার জন্য।

কার্যপ্রণালী বিধি মেনে সংসদ চালানোর ওপর জোর দিয়ে স্পিকার বলেন, আমি প্রতিদিনই বলি যে রুলস অফ প্রসিডিউর বইটা একটু পড়েন। যদি এই সংসদ বিধি মোতাবেক পরিচালিত না হয়, এটি আর জাতীয় সংসদ থাকবে না।

অতীতের অভিজ্ঞতা টেনে তিনি বলেন, নাজমুল হুদা তৎকালীন মাননীয় সদস্য একটা বক্তব্য করলেন। সদস্যরা ওয়াকআউট করে চলে গেলেন। আমরা ভাবলাম যে আধা ঘণ্টা পরে ফিরে আসবে। ওই বয়কট দুই বছর চলেছে।

সামান্য কারণে উত্তেজনা সৃষ্টি না করার আহ্বান জানিয়ে স্পিকার বলেন, সংসদে প্রত্যেক সদস্যের বাকস্বাধীনতা আছে।

বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রশংসা করে ফজলুর রহমান বলেন, সংসদ নেতা অনেক মহান কাজ’ করেছেন। ৭৮ জনকে ২২২ জনের সমান সমান ভাগ দিয়া কমিটি করেছে।

যুদ্ধাপরাধীদের শোক প্রস্তাব ও ইনডেমনিটি ইস্যু 

বক্তব্য পুনরায় শুরু করে যুদ্ধাপরাধীদের শোক প্রস্তাব ও ইনডেমনিটি ইস্যুতে কথা বলেন ফজলুর রহমান। তিনি বলেন, ১৯৭১ সনের ১৪ ডিসেম্বরকে পালন করা হয় শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। সেই মুনীর চৌধুরী, আব্দুল আলীম চৌধুরী, শহীদুল্লাহ কায়সার থেকে ধরে শত শত বুদ্ধিজীবীকে যারা হত্যা করেছিল তাদেরকে বলা হয় আল-বদর। আমি খুব দুর্ভাগা, এই হাউসে প্রস্তাব হয়েছে— তাদের ব্যাপারেও শোক প্রস্তাব হয়েছে। আমি একা হলেও এটা প্রতিবাদ করতাম। ইতিহাস ভুল বার্তা যাবে যদি আমরা যুদ্ধাপরাধীর ব্যাপারে শোক প্রস্তাব নেই। আরেকটা কথা, পুলিশের ব্যাপারে যে ইনডেমনিটি দেওয়া হয়েছে। ৫ আগস্টের পরে যে থানা লুট হয়েছে, পুলিশ হত্যা হয়েছে, তারা তো তখন যুদ্ধ করে নাই, তারা তো নিরপরাধ। এত অস্ত্র গে্লো কোথায়? ৫ আগস্টের পরে যে ঘটনাগুলো হয়েছে সেগুলো তো কোনও আইনে ইনডেমনিটি পাওয়ার কথা না। সেটার জন্য তদন্ত হওয়া উচিত।

প্রধানমন্ত্রীকে সতর্কবার্তা

শেষে তিনি প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে এক সতর্কবাণী উচ্চারণ করেন। তিনি বলেন, সর্বশেষ কথাটি হলো, আমার মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমি যাকে ভীষণ শ্রদ্ধা করি। দেশের ভেতরে যতই চক্রান্ত হোক, আমার নেতা সংসদ নেতা অনেক মহান কাজ করেছেন। সমান সমান ভাগ দিয়ে কমিটি করেছেন। আমি আমার নেতাকে বলবো, সিরাজউদ্দৌলা আর মোহাম্মদী বেগ কিন্তু এক না। মোহাম্মদী বেগ কিন্তু সিরাজউদ্দৌলাকে হত্যা করেছিল। এই কথাটি বলেই আপনাকে ধন্যবাদ জানিয়ে আমার বক্তব্য শেষ করছি। 

এরপর বিরোধী দলীয় নেতা বক্তব্য দেন।

এরপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দাঁড়িয়ে কথা বলতে চাইলে স্পিকার জানতে চান, তিনি কোন বিষয়ের ওপর বলবেন।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আমি কোনো উত্তেজনা সৃষ্টি করব না সংসদের স্বার্থে।

তিনি বলেন, যে অ্যাটমসফিয়ারে আমরা এখানে আলাপ আলোচনা করি, মাঝেমধ্যে সেটা কিছু উত্তেজনা সৃষ্টি হবেই, সেটা স্বাভাবিক।

ফজলুর রহমানকে ‘ইতিহাসে সমৃদ্ধ’ প্রবীণ সংসদ সদস্য হিসেবে বর্ণনা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমরা এখন ভূগোলে আছি। আমরা বেশি ইতিহাস চর্চা করতে গেলে মাঝেমধ্যে কিছু ব্যত্যয় হবে।

সেই সঙ্গে তিনি বলেন, নতুন করে আমার মনে হয় যে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের ভিত্তিতে জাতিকে আর বিভক্ত না করি।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সংসদের কার্যক্রম এমনভাবে চালাতে হবে, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এবং জুলাই যোদ্ধারা বুঝতে পারে, জাতির প্রত্যাশা পূরণের জন্য সংসদ সদস্যরা এখানে আছেন।

এই বিভাগের আরও খবর