ট্রাম্পকে যুদ্ধে ঠেলে দিতে ইসরাইলের ভূমিকা: কেন নীরব মার্কিন সংবাদমাধ্যম?
আমার সন্দেহ, ইসরাইলের সমালোচনা এড়ানোর প্রধান কারণ হলো তারা মনে করে এটি হবে ‘ইহুদি-বিদ্বেষ’ (Antisemitism)। কিন্তু এ ধারণা যেমন বিপজ্জনক, তেমনি ভুল।
গত ৭ এপ্রিল নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত একটি অসাধারণ নিবন্ধে বর্ণনা করা হয়েছে যে, ডোনাল্ড ট্রাম্প কীভাবে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। হোয়াইট হাউসের ‘সিচুয়েশন রুম’ বিদেশি নেতাদের সঙ্গে সরাসরি বৈঠকের জন্য ব্যবহার করা অত্যন্ত অস্বাভাবিক। কিন্তু এবার কেবল বৈঠকই হয়নি, ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু পুরো প্রেজেন্টেশন স্পেসটি নিজের দখলে নিয়েছিলেন। তার পেছনে স্ক্রিনে উপস্থিত ছিলেন মোসাদ প্রধান এবং ইসরাইলি সামরিক কর্মকর্তারা।
নিবন্ধে সেই দৃশ্যের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলা হয়েছে, ‘নেতানিয়াহুর পেছনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে তারা এমন এক যুদ্ধকালীন নেতার ভাবমূর্তি তৈরি করেছিলেন, যিনি তার পুরো টিম নিয়ে পরিবেষ্টিত।’ নিবন্ধটি স্পষ্ট করে দেয় যে, দ্রুত যুদ্ধের পক্ষে নেতানিয়াহুর সেই ‘কঠোর চাপ’ (hard sell) ইরানের ওপর হামলায় ইসরাইলের অংশীদার হওয়ার ক্ষেত্রে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তে চূড়ান্ত ভূমিকা রেখেছিল।
বর্তমান মূলধারার সংবাদমাধ্যমে এ যুদ্ধ নিয়ে যে ধরনের খবর প্রকাশিত হচ্ছে, তার তুলনায় এ নিবন্ধটি ব্যতিক্রম। সাধারণত ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে ইসরাইলের ভূমিকার কথা সংবাদমাধ্যমগুলো এড়িয়ে যায়। যেমন—আমি শ্রদ্ধা করি এমন একজন সাংবাদিক র্যাচেল ম্যাডো। রাশিয়ার প্রভাবের বিষয়ে তিনি বরাবরই স্পষ্টভাষী ও সাহসী। কিন্তু গত ২৮ ফেব্রুয়ারি এমএসএনও-তে ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধে যাওয়ার কারণ অনুসন্ধানে ‘ফলো দ্য মানি’ পর্বে তিনি অদ্ভুত নীরবতা পালন করেছেন।
সংবাদমাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এড়িয়ে যাওয়া বা গোপন করা রাষ্ট্রীয় প্রোপাগান্ডারই একটি রূপ। সেই অনুষ্ঠানে ম্যাডো শ্রোতাদের প্রশ্ন করেছিলেন, ‘কারা চায় ইরান মানচিত্র থেকে মুছে যাক এবং কেন? ইরানের শত্রু বা প্রতিদ্বন্দ্বী কারা?’ ম্যাডোর পরবর্তী আলোচনায় ইঙ্গিত দেওয়া হয় যে, এর জন্য প্রধানত দায়ী উপসাগরীয় আরব দেশগুলো। তার মতে, ওই দেশগুলো যেন ‘মার্কিন সামরিক বাহিনীকে ভাড়া করেছে’। নিউ ইয়র্ক টাইমসের তথ্যের আলোকে ম্যাডোর সেই আলোচনা এখন গণতন্ত্র ও মুক্ত সংবাদপত্রের সমর্থকদের জন্য উদ্বেগের কারণ হওয়া উচিত।
সাধারণভাবে বলতে গেলে, পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলো এক ধরনের স্ব-আরোপিত সেন্সরশিপের (self-censorship) মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অথচ একটি বিষয় দীর্ঘকাল ধরে পরিষ্কার- নেতানিয়াহু এবং ট্রাম্পের মধ্যে একটি দ্ব্যর্থহীন ‘ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক’ রয়েছে, যা ট্রাম্পের দুই মেয়াদের প্রশাসনেরই একটি স্থায়ী বৈশিষ্ট্য।
পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো প্রশংসনীয়ভাবে এটি পরিষ্কার করেছে যে, পুতিনের সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্ক আগের যে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের চেয়ে গভীর। কিন্তু মার্কিন নীতিতে ইসরাইলের প্রভাবের বিষয়ে সংবাদমাধ্যমে একই স্তরের স্বচ্ছতা দেখা যায় না। অথচ রাশিয়ার চেয়ে ইসরাইলের প্রভাব অনেক বেশি দৃশ্যমান।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- প্রোপাগান্ডা মানে কেবল মিথ্যা বলা নয়। সংবাদমাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এড়িয়ে যাওয়াও প্রোপাগান্ডার অন্যতম কৌশল। যেমন, কোনো বিরোধী দলের রাজনীতিবিদকে গ্রেফতার করা হলো কিন্তু সেটি যে সরকারের সাজানো নাটক ছিল তা উল্লেখ করা হলো না—তবে সেটি প্রোপাগান্ডা, যদিও সংবাদমাধ্যম এখানে মিথ্যা বলেনি; তারা কেবল সত্যের একটি অংশ এড়িয়ে গেছে।
প্রোপাগান্ডা প্রায়ই তথ্য গোপনের মাধ্যমে ঘটে। প্রকৃতপক্ষে, বাস্তবতার একটি আংশিক চিত্র তুলে ধরা প্রোপাগান্ডার সবচেয়ে মারাত্মক রূপ। সংবাদমাধ্যমের যেসব ব্যক্তিত্ব অন্য বিষয়ে সাহসী সত্যভাষী, তাদের এই একটি বিষয়ে নীরবতা মূলত অপরাধীদের আড়াল করার কাজ করে। এ নীরবতা এক ধরনের দায়বদ্ধতা বা অপরাধের অংশীদারিত্ব।
মার্কিন নীতিতে রাশিয়া বা উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রভাব থাকতে পারে। কিন্তু ইসরাইলের প্রভাব অন্য যে কোনো দেশের চেয়ে অনেক বেশি। আগেরগুলোর কথা বলে পরেরটি এড়িয়ে যাওয়া স্রেফ প্রোপাগান্ডা। নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করা আর মিথ্যা বলার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।
কেন এই নীরবতা? যারা ইসরাইলের অনিষ্টকারী প্রভাবের কথা এড়িয়ে যান, তারা হয়তো ইচ্ছাকৃতভাবে খারাপ মানুষ নন। বরং আমার সন্দেহ, তারা মনে করেন ইসরাইলের সমালোচনা করা মানেই ইহুদি-বিদ্বেষকে উসকে দেওয়া। কিন্তু এ যুক্তি নিজেই ত্রুটিপূর্ণ। ইসরাইল রাষ্ট্র আর ইহুদি জনগোষ্ঠীকে এক করে ফেলা মোটেও ঠিক নয়। ইসরাইল রাষ্ট্রের সমালোচনাকে ইহুদিদের ওপর আক্রমণ হিসেবে দেখালে তা প্রকারান্তরে ইহুদি-বিদ্বেষী ধারণাকেই শক্তিশালী করে।
নাৎসিবাদের একটি মূল ধারণা ছিল যে, ইহুদিরা সংবাদমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করে। ইসরাইলের স্বার্থ আর ইহুদিদের স্বার্থকে এক করে দেখিয়ে এবং সেই ভিত্তিতে সমালোচনা সীমিত করে সংবাদমাধ্যম মূলত সমাজে ওই ক্ষতিকর ভ্রান্ত ধারণাকেই (Antisemitic trope) ডালপালা মেলতে সাহায্য করছে।
পরিশেষে, ইসরাইল রাষ্ট্র এখন ফিলিস্তিনিদের ওপর গণহত্যা চালাচ্ছে (এবং লেবাননে জাতিগত নিধন ও উচ্ছেদ চালাচ্ছে)। ইসরাইল সরকারের এই কর্মকাণ্ডকে আড়াল করা মানে ইহুদিদের এ অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলা। এটি ক্লাসিক ইহুদি-বিদ্বেষ, যা বহু শতাব্দী পুরোনো। আমরা অন্য কোনো গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে এমন যুক্তি মেনে নিই না। কোনো ইসলামিক শাসনব্যবস্থা অপরাধ করলে তার দায় সব মুসলমানের ওপর চাপানো যেমন ইসলামোফোবিয়া, এখানেও বিষয়টি তাই।
মার্কিন নীতিতে ইসরাইলের হস্তক্ষেপ আড়াল করার কোনো নৈতিক ভিত্তি নেই। যে সংবাদমাধ্যম খোলাখুলি মিথ্যা বলে, সে স্বাধীন নয়। কিন্তু যে সংবাদমাধ্যম কেবল আংশিক সত্য বলে, সে সম্ভবত আরও বেশি পরাধীন; কারণ এ অর্ধসত্যগুলো তার পরাধীনতাকে আড়াল করার মুখোশ হিসেবে কাজ করে।

