পর্দায় ফিরলেন মাইকেল, তবে আড়ালেই রয়ে গেল জীবনের অন্ধকার
মাইকেল জ্যাকসনের জীবন নিয়ে নির্মিত নতুন সিনেমাটি তার জীবনের কেবল একপাক্ষিক ও বাছাই করা অংশই তুলে ধরেছে। তবে পর্দার বাইরের এ রূপান্তর সম্ভবত সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার সঙ্গেই বেশি মানানসই।
কেবল মুনাফালোভী স্টুডিও কর্তারাই নন, ভক্তরাও অনেক সময় তাদের প্রিয় তারকার জীবনের অন্ধকার অধ্যায়গুলো এড়িয়ে যেতেই বেশি পছন্দ করেন।
কোটি কোটি মানুষের মতো আমিও এ সপ্তাহে ‘মাইকেল’ দেখতে গিয়েছিলাম। আমি জানতাম আমি কী দেখতে যাচ্ছি—সিনেমাটির বেশির ভাগ সমালোচনা ছিল বেশ রূঢ়। কেউ একে বলেছেন ‘কলঙ্ক মোচনের চেষ্টা’ (হোয়াইটওয়াশ), কেউ বলেছেন ‘ভুতুড়ে’, আবার কেউ একে ‘বিলাসবহুল প্রমোদতরীর বিনোদন’ বা ‘১২৭ মিনিটের ট্রেলার মন্টাজ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। অথচ মাইকেল জ্যাকসনের বিশ্বতারকা হয়ে ওঠার এ সিনেমাটি বায়োপিক বা জীবনীচিত্রের ইতিহাসে উদ্বোধনী আয়ের সব রেকর্ড ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। মুক্তির প্রথম সপ্তাহান্তেই এটি বিশ্বজুড়ে ২১ কোটি ৭০ লাখ ডলার আয় করেছে এবং ধারণা করা হচ্ছে প্রদর্শন শেষে এর আয় ৯০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যাবে।
আমি নিজেকেই প্রশ্ন করলাম- আমরা যদি জানিই যে, এ সিনেমাগুলো অনেক সময় সত্য গোপন করে সাজানো একপ্রকার ‘নরম খিচুড়ি’, যেখানে উত্তরাধিকারী বা আইনজীবীরা শিল্পীর জীবনের আস্ত এক একটি অধ্যায় ছেঁটে ফেলেছেন—তবে আমরা কেন দলে দলে সিনেমা হলে ভিড় করছি? অবশ্যই এর একটি সহজ ব্যাখ্যা আছে। এ জীবনীচিত্রগুলো দর্শকদেরতাঁদের প্রিয় শিল্পীর স্বর্ণযুগকে পুনরায় অনুভব করার এবং তাদের জনপ্রিয় গানগুলোতে ডুবে থাকার সুযোগ করে দেয়।
তবে এর পেছনে আরও একটি কারণ আছে বলে আমার সন্দেহ। সেটি হলো প্রতিভার প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং তা ব্যাখ্যা করার এক অদ্ভুত তাড়না।
আমরা সবসময়ই এটা মানতে কষ্ট পাই যে, কোনো অসাধারণ প্রতিভা বিশেষ কোনো পরিস্থিতি ছাড়াই স্রেফ প্রকৃতিগতভাবে বিদ্যমান থাকতে পারে। প্রায় ২ হাজার বছর আগে প্লুটার্ক যখন ‘প্যারালাল লাইভস’ লিখেছিলেন, তখন থেকেই এ বিশ্বাস জেঁকে বসেছে যে—যদি কোনো মহৎ জীবনকে খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করা যায়, তবে তার সফলতার রহস্য উন্মোচন করা সম্ভব। এ তাড়না থেকেই রোমান্টিক যুগের কবিরা জোর দিয়ে বলতেন যে, কবির মনের ক্ষত না বুঝলে তার কবিতা বোঝা সম্ভব নয়। প্রতিভা যে অযাচিতভাবে এবং কোনো পূর্বশর্ত ছাড়াই আসতে পারে, তা আমরা মেনে নিতে পারি না।
আমরা জানতে চাই- সেই সুর আর শিল্পের উৎস কোথায়। আমরা সেই শৈশবকে খুঁজতে চাই, সেই জীবন বদলে দেওয়া অভিজ্ঞতাগুলোকে জানতে চাই যা ‘থ্রিলার’ বা ‘বোহেমিয়ান র্যাপসোডি’র জন্ম দিয়েছে। শেক্সপিয়রের মনস্তত্ত্ব নিয়ে লিখতে গিয়ে কবি জন কিটস একটি শব্দবন্ধ ব্যবহার করেছিলেন—‘নেগেটিভ ক্যাপাবিলিটি’ বা নেতিবাচক সক্ষমতা। যার অর্থ হলো ‘অনিশ্চয়তা, রহস্য আর সন্দেহকে গ্রহণ করার ক্ষমতা’। পরিহাসের বিষয় হলো, কিটস এটি দিয়ে বুঝিয়েছিলেন কেন প্রতিভাকে ব্যাখ্যা করা যায় না। আর সেই ব্যাখ্যার অতীত রহস্যই আমাদের বারবার চেষ্টা করতে বাধ্য করে।
জীবনীচিত্রগুলো এ রহস্য সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে তা কখনই পারে না। ‘মাইকেল’-এর ক্ষেত্রে তার জীবনের অনেক বড় অংশ বাদ দেওয়া হয়েছে। সিনেমাটি ১৯৮৮ সালে এসে থমকে যায়। ফলে শিশু যৌন নির্যাতনের সেই অভিযোগগুলো পুরোপুরি আড়াল করা হয়েছে, যা জ্যাকসনের জীবনের শেষ কয়েক দশকজুড়ে কালো ছায়া ফেলেছিল এবং আজও তার উত্তরাধিকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। জ্যাকসন আমৃত্যু এ অভিযোগ অস্বীকার করে গেছেন। কিন্তু জীবনের অন্ধকারতম অংশগুলো বাদ দিয়ে আমরা কীভাবে একজন মানুষের জীবন ও কর্মকে বিচার করতে পারি?
জ্যাকসনের সম্পত্তির উত্তরাধিকারীরা (যারা এ সিনেমার প্রযোজকও বটে) লক্ষ্য করেছিলেন যে, এক অভিযোগকারীর সঙ্গে সমঝোতার চুক্তিতে একটি ধারা ছিল—যা কোনো সিনেমায় তার উল্লেখ বা চিত্রায়ন নিষিদ্ধ করে। ফলে সিনেমার শেষ এক-তৃতীয়াংশ ফেলে দিয়ে পুনরায় শুটিং করতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত যা টিকে আছে তা হলো কিছু রোমহর্ষক মিউজিক্যাল সিকোয়েন্স এবং জাফার জ্যাকসনের অবিশ্বাস্য শারীরিক অভিনয়—কিন্তু মানুষ মাইকেল জ্যাকসনকে এখানে খুঁজে পাওয়া ভার।
তা সত্ত্বেও, সিনেমায় কিছু অস্বস্তিকর ঝলক ছিল: পিটার প্যানের প্রতি জ্যাকসনের আসক্তি, নেভারল্যান্ডের স্থাপত্য, আর বাস্তব জগত থেকে বাঁচতে এক মানুষের কাল্পনিক জগত তৈরির চেষ্টা। কিন্তু সিনেমাটি তার সৃজনশীল প্রক্রিয়া বা সেই দ্বন্দ্বগুলোর কোনো হদিস দিতে পারেনি, যা তাকে ২০ শতকের অন্যতম আকর্ষণীয় ও বিতর্কিত শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। আমরা তার অত্যাচারী বাবা জোসেফ জ্যাকসনকে খলনায়ক হিসেবে দেখি। কিন্তু যখন মাইকেল নিজেই একটি নৈতিক সংকটে পরিণত হন, তখন কী হয়? অর্ধেকটা দিয়ে একটি জীবনকে বোঝা সম্ভব নয়।
স্টুডিও কর্তাদের কাছে জীবনের বাছাই করা অংশ তুলে ধরা কোনো সমস্যাই নয়। বর্তমানে চলচ্চিত্র শিল্প যখন আগে থেকে প্রতিষ্ঠিত জনপ্রিয় বিষয়ের (ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি) ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল, তখন মিউজিক বায়োপিক হলো একটি ‘পারফেক্ট প্রোডাক্ট’। এতে আগে থেকেই তৈরি ভক্তকুল আছে, আছে জনপ্রিয় সব গান আর নস্টালজিয়ার হাতছানি। ২০১৮ সালের ফ্রেডি মার্কারির জীবনীচিত্র ‘বোহেমিয়ান র্যাপসোডি’ ছিল এর টার্নিং পয়েন্ট। মার্কারির যৌন পরিচয় এবং এইডস আক্রান্ত হওয়ার বিষয়গুলো এড়িয়ে যাওয়ার জন্য ব্যাপক সমালোচিত হওয়া সত্ত্বেও এটি ব্যবসায়িকভাবে বিশাল সফল হয়েছিল। হলিউড এখান থেকে শিক্ষা নিয়েছে যে—দর্শকরা জটিলতা নয়, স্রেফ বিনোদন চায়।
সেই ধারাবাহিকতায় আমরা বব ডিলান, এলভিস, ব্রুস স্প্রিংস্টিন, এলটন জন বা অ্যামি ওয়াইনহাউসদের বায়োপিক পেয়েছি। সামনে আসছে বিটলস নিয়ে চারটি আলাদা সিনেমা। জনি মিচেল বা জ্যানিস জপলিনদের নিয়েও কাজ চলছে।
শিল্পীদের উত্তরাধিকারীরাও গল্পের কিছু অংশ বলতে এবং কিছু লুকাতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। ২০০৯ সালে যখন মাইকেল জ্যাকসন মারা যান, তখন তিনি ৫০ কোটি ডলারেরও বেশি ঋণে ডুবে ছিলেন। আজ তার সম্পত্তির মূল্য ২০০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। রয়্যালটি, মিউজিক্যাল আর এ সিনেমার মাধ্যমে তার সেই সাম্রাজ্য পুনর্গঠিত হয়েছে। এটি কট্টর ভক্ত আর সাধারণ শ্রোতা—উভয়কেই তৃপ্ত করে। অনেকেই চান জ্যাকসনের ফেলে যাওয়া গানগুলোর সঙ্গে যুক্ত থাকতে, যেখানে কোনো কলঙ্কজনক অভিযোগ তাদের আনন্দকে বিষাদগ্রস্ত করবে না।
কিন্তু যখন কারও জীবনকে এভাবে ‘সম্পাদনা’ করে পরিবেশন করা হয়, তখন আমরা সবাই কিছু না কিছু হারাই। চার্লস বুকোস্কি তার এক কবিতায় কিছু ক্ষতিগ্রস্ত মহাতারকার তালিকা দিয়েছিলেন—যাদের মধ্যে হেমিংওয়ে, ফকনার, সিলভিয়া প্লাথ এবং দস্তয়েভস্কি ছিলেন। তিনি তাদের ‘গৌরবের উন্মত্ত কুকুর’ বলে ডেকেছিলেন, যারা আমাদের দিকে এক চিলতে আলো ছুড়ে দেন। প্রতিভাধর ব্যক্তিরাও ভুলের ঊর্ধ্বে নন এবং তারাও গুরুতর অন্যায় করতে পারেন।
সম্ভবত ‘মাইকেল’ সিনেমাটি আমাদের এ সত্য মেনে নেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে যে, অনুমোদিত জীবনীচিত্রগুলো আসলে কী করতে পারে না। এগুলো রাস্তার পাশের সেই নীল ফলকের (ব্লু প্লেক) মতো—যা শুধু আমাদের জানায় যে ‘এখানে একদা একজন মহান ব্যক্তি বাস করতেন’, তার বেশি কিছু নয়। আমরা যদি সত্যিই বুঝতে চাই এই শিল্পীদের মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার পেছনের আসল গল্প কী, তবে আমাদের আরও অগোছালো আর অস্বস্তিকর সত্যের মুখোমুখি হতে হবে। যা হয়তো কোনোদিন বড় পর্দার ব্লকবাস্টার সিনেমা হয়ে উঠবে না।

