img

ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ হজ। এটি শুধু ইবাদত নয়, বরং একটি বৃহৎ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাপনার অংশ—যেখানে সৌদি আরব ও হজযাত্রী প্রেরণকারী দেশগুলোর মধ্যে সমন্বিত কার্যক্রম পরিচালিত হয়। নীতিনির্ধারণ ও ব্যবস্থাপনার মূল দায়িত্ব থাকে সৌদি সরকারের ওপর, আর বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশ সেই নির্দেশনা অনুসরণ করেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করে।

সৌদি সরকারের ঘোষিত সময়সূচি অনুযায়ী, চলতি বছর ১৮ এপ্রিল থেকে বাংলাদেশ থেকে হজ ফ্লাইট শুরু হয়েছে। শেষ ফ্লাইট নির্ধারিত রয়েছে ২১ মে ২০২৬। চাঁদ দেখা সাপেক্ষে ২৬ মে পবিত্র হজ অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ বছর বাংলাদেশ থেকে মোট ৭৮ হাজার ৫০০ জন হজ পালন করবেন, এবং প্রায় সব হজযাত্রীর ভিসা ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।

মেডিকেল ফিটনেস ও স্বাস্থ্য সংক্রান্ত কড়াকড়ি

এবার হজে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে মেডিকেল ফিটনেস বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। গুরুতর হৃদ্রোগ, লিভার সিরোসিস, ডায়ালাইসিসনির্ভর কিডনি রোগ, মানসিক রোগ, ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভাবস্থা, যক্ষ্মা কিংবা চিকিৎসাধীন ক্যানসার রোগীদের হজে যাওয়ার অনুমতি নেই।

এছাড়া বার্ধক্যজনিত কারণে অক্ষম বা ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও একই নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য। সৌদি আরবে পৌঁছানোর পরও কেউ মেডিকেল ফিটনেসবিহীন হিসেবে চিহ্নিত হলে তাকে সেখান থেকেই ফেরত পাঠানো হতে পারে।

পাসপোর্ট, ভিসা ও হজক্যাম্পে উপস্থিতি

বাংলাদেশের কোটাভুক্ত হজযাত্রীদের অবশ্যই বৈধ বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী হতে হবে, যার মেয়াদ ৩০ নভেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত থাকতে হবে। ভিসা সংগ্রহ করে তা সঙ্গে রাখা বাধ্যতামূলক, যা ই-হজ সিস্টেম বা সংশ্লিষ্ট এজেন্সির মাধ্যমে পাওয়া যাবে।

ফ্লাইটের দিন ঢাকার যাত্রীদের কমপক্ষে ৬ ঘণ্টা আগে এবং ঢাকার বাইরের যাত্রীদের একদিন আগে আশকোনা হজক্যাম্পে উপস্থিত থাকতে হবে। এখানে বিনা মূল্যে থাকার ব্যবস্থা থাকলেও খাবার নিজ খরচে গ্রহণ করতে হবে।

লাগেজ ব্যবস্থাপনা ও ওষুধপত্র

প্রতিটি হজযাত্রী সর্বোচ্চ ৪৬ কেজি (দুটি ব্যাগে ২৩ কেজি করে) চেকইন লাগেজ এবং ৭ কেজির একটি কেবিন ব্যাগ বহন করতে পারবেন। লাগেজে নাম, পাসপোর্ট নম্বর, পিআইডি, মোবাইল নম্বর ও এজেন্সির তথ্য ইংরেজিতে লিখে রাখা জরুরি।

কেবিন ব্যাগে ইহরামের কাপড়, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও একটি অতিরিক্ত পোশাক রাখা উচিত। যারা ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন, তাদের অন্তত ৫০ দিনের ওষুধ প্রেসক্রিপশনসহ সঙ্গে রাখতে হবে। লাগেজ হারিয়ে গেলে সংশ্লিষ্ট হজ অফিস বা এয়ারপোর্টের ‘লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড’ বিভাগে দ্রুত জানাতে হবে।

নিষিদ্ধ দ্রব্য ও আর্থিক সতর্কতা

সৌদি আইন অনুযায়ী নেশাজাতীয় দ্রব্য, তামাকজাত পণ্য, পচনশীল খাদ্য বা রান্না করা খাবার বহন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এ ধরনের জিনিস বহন করলে আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে।

প্রতিদিন খাবারের জন্য আনুমানিক ৩৫ সৌদি রিয়াল ব্যয় হতে পারে, তাই সে অনুযায়ী অর্থ প্রস্তুত রাখা উচিত। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী বৈদেশিক মুদ্রা বহন করতে হবে। হজ ও ওমরাহ বিষয়ক সহায়িকা বই সঙ্গে রাখলে আনুষ্ঠানিকতা বুঝতে সুবিধা হবে।

ইমিগ্রেশন ও মক্কা রুট সুবিধা

ঢাকা থেকেই হজযাত্রীদের বোর্ডিং ও ইমিগ্রেশন সম্পন্ন হবে। ‘মক্কা রুট ইনিশিয়েটিভ’-এর আওতায় সৌদি অংশের ইমিগ্রেশনও আগেই সম্পন্ন করা হবে, যা ভ্রমণকে সহজ করবে।

সৌদিতে আবাসন ও নুসুক কার্ড

সৌদিতে পৌঁছানোর পর নির্ধারিত পরিবহন হজযাত্রীদের আবাসস্থলে পৌঁছে দেবে। লাগেজও সরাসরি হোটেলে পৌঁছে দেওয়া হবে। প্রতিটি হজযাত্রীকে নুসুক কার্ড, মোয়াল্লেম কার্ড ও পরিচয়পত্র সবসময় সঙ্গে রাখতে হবে। নুসুক কার্ড ছাড়া বাইরে বের হলে আইনগত সমস্যায় পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আইন-শৃঙ্খলা মেনে চলা

সৌদি আরবে অবস্থানকালে কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, বিক্ষোভ বা অনৈতিক কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করলে শাস্তির মুখোমুখি হতে পারে। অসুস্থ হলে মক্কা, মদিনা ও জেদ্দায় বাংলাদেশি মেডিকেল সেন্টার থেকে বিনামূল্যে চিকিৎসা পাওয়া যাবে।

দলগত ইবাদত ও গাইড অনুসরণ

হজ মূলত দলগত ইবাদত। প্রতি ৪৬ জনের জন্য একজন গাইড থাকেন, যার নির্দেশনা মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি। মিনা, আরাফাহ, মুজদালিফা ও জামারার আনুষ্ঠানিকতা অবশ্যই দলবদ্ধভাবে সম্পন্ন করতে হবে। একাকী চলাফেরা করলে পথ হারানোর ঝুঁকি থাকে। প্রয়োজনে ‘লাব্বাইক’ অ্যাপ বা হটলাইন নম্বরে যোগাযোগ করতে হবে।

তথ্যসেবা ও মৃত্যু পরবর্তী ব্যবস্থা

হজ পোর্টাল, হটলাইন বা মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া যাবে। কোনো অভিযোগ থাকলে তা অনলাইনে জমা দেওয়া যাবে এবং প্রমাণ উপস্থাপন করতে হবে। হজ চলাকালে কেউ মৃত্যুবরণ করলে সৌদি আইন অনুযায়ী সেখানেই দাফন করা হয় এবং পরবর্তীতে মৃত্যু সনদ পরিবারকে প্রদান করা হয়।

দেশে ফেরা ও জমজম পানি

ফেরার সময় নির্ধারিত ওজনের বেশি লাগেজ নেওয়া যাবে না। লাগেজে জমজম পানি বহন নিষিদ্ধ, তবে দেশে পৌঁছানোর পর প্রত্যেক হজযাত্রীকে ৫ লিটার জমজম পানি দেওয়া হবে।

সবশেষে বলা যায়, হজ একটি ফরজ ইবাদত, যার যথাযথ প্রস্তুতি ও নিয়ম মেনে পালন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি ও বাংলাদেশের নির্ধারিত নির্দেশনা সম্পর্কে সচেতন থাকলে হজ পালন হবে আরও সহজ, সুশৃঙ্খল ও অর্থবহ।

এই বিভাগের আরও খবর


সর্বশেষ