img

বাংলাদেশের কৃষি বিভাগ বলছে, চোখ ধাঁধানো বিভিন্ন রংয়ের ক্যাপসিকাম এর মধ্যেই বাংলাদেশে একটি জনপ্রিয় সবজিতে পরিণত হয়েছে এবং এর চাহিদা বাড়তে থাকায় টবে ও জমিতে এর চাষ ক্রমশই বাড়ছে।

কৃষকরা অবশ্য বলছেন, প্রাথমিক ব্যয় বেশি হওয়া সত্ত্বেও বাজারে চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়া এবং তুলনামূলক ভালো আয়ের সুযোগ থাকায় উচ্চমূল্যের এই সবজি চাষের দিকে উদ্যোক্তারা বেশি ঝুঁকছেন। খবর বিবিসি বাংলার। 

রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের বাজার ও সুপারশপগুলোতে কয়েকটি রংয়ের ক্যাপসিকাম দেখা যায়। কৃষিবিদরা বলছেন, সবুজ, হলুদ, লাল, কমলা, বেগুনি– প্রতিটির পেছনে লুকিয়ে আছে আলাদা স্বাদ ও পুষ্টিগুণ।

কৃষি বিভাগের টিস্যুকালচার ল্যাবরেটরি কাম হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপন ও উন্নয়ন প্রকল্প পরিচালক তালহা জুবাইর মাসরুর বলেন, এটি কাঁচা অবস্থায় খাওয়া যায় এবং আধুনিক খাদ্যাভ্যাসে সালাদ, পিৎজ্জা, সাসলিকসহ বিভিন্ন ফাস্টফুড আইটেমে ক্যাপসিকাম একটি অপরিহার্য উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ফলে শহরাঞ্চলসহ সর্বত্র এর স্থায়ী বাজার চাহিদা তৈরি হয়েছে।  

যদিও বাংলাদেশে ঠিক কখন এর চাষাবাদ শুরু হয়েছে সে সম্পর্কে তথ্য পাওয়া কঠিন। কৃষি বিভাগ বলছে, ২০১৪-১৫ সালের দিকে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ক্যাপসিকাম বাজারে আসতে শুরু করে। এরপর থেকে ধারাবাহিকভাবেই এর উৎপাদন বেড়েই চলেছে। 

বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়নে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে ক্যাপসিকামের উৎপাদন তিন গুনেরও বেশি বেড়েছে এবং দেশের মোট উৎপাদনের ৫৫ শতাংশই ক্যাপসিকাম আবাদ হয় ভোলা জেলায়।

ওই জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. খায়রুল ইসলাম মল্লিক বলেন, জেলার দুটি উপজেলায় ১৮০ হেক্টরের মতো জমিতে ক্যাপসিকাম চাষ হচ্ছে। 

রঙিন সবজি কিন্তু গুন কি আলাদা

ক্যাপসিকাম প্রধানত উত্তর আমেরিকার মেক্সিকো ও দক্ষিণ আমেরিকার পেরু অঞ্চলের কৃষিপণ্য হিসেবে পরিচিত এবং ঝাল ও মিষ্টি উভয় ধরনের ক্যাপসিকামই বিশ্বজুড়ে চাষাবাদ হচ্ছে।

কৃষি তথ্য সার্ভিস বলছে, ক্যাপসিকামে ভিটামিন এ, সি এবং কোলাজেন থাকে। এসব উপাদান রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে এবং ত্বক ও অস্থি সন্ধি ভালো রাখতে সাহায্য করে।

এছাড়া এতে ক্যাপসিসিন নামক এক ধরনের উপাদান থাকে, যা শরীরে কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।

কৃষিবিদ তালহা জুবাইর মাসরুর বলছেন, লাল, হলুদ, সবুজ, কমলা ও বেগুনি বিভিন্ন রঙের এই সবজি কেবল দৃষ্টিনন্দনই নয়, বরং পুষ্টিগুণেও সমৃদ্ধ।

তিনি বলেন, বিশেষ করে হলুদ, কমলা ও লাল ক্যাপসিকামের বাজারে চাহিদা তুলনামূলক বেশি এবং বছর জুড়েই এর ভালো বাজার মূল্য পাওয়া যায়। রঙিন ক্যাপসিকাম ভিটামিন ‘সি’, ‘এ’ এবং বিভিন্ন ধরনের অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে ভরপুর, যা মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে সহায়তা করে।

বাজারে ক্যাপসিকাম বিভিন্ন রংয়ের দেখা গেলেও ফসলটি গাছে আসতে শুরু করে সবুজ রং নিয়েই। চারা লাগানোর দু মাস পরই গাছে ফল আসতে শুরু করে তবে সবুজ রং থেকে অন্য রং আসতে তিন মাসের মতো সময় লাগে বলে জানিয়েছেন যশোরের ক্যাপসিকাম চাষি মানিক রাজা।

এরপর একই গাছ থেকে অন্তত নয় মাস পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়। 

বীজ, চাষ ও বাজার সম্ভাবনা

বাংলাদেশের ভোলা, সিলেট, নওগাঁ, চুয়াডাঙ্গা, কুড়িগ্রাম ও যশোর অঞ্চলের কিছু জেলা ও উপজেলায় ক্যাপসিকামের চাষ হচ্ছে। চলতি বছর কুমিল্লাসহ আরও কয়েকটি জায়গায় প্রথমবারের মতো ক্যাপসিকাম চাষের তথ্য পাওয়া গেছে।

অনেকে আবার শখ করে টবেও ক্যাপসিকাম উৎপাদনের চেষ্টা করছেন এবং এই প্রবণতাও সাম্প্রতিক সময়ে বেশ বেড়েছে।

কৃষি তথ্য সার্ভিস বলছে, অতি সহজেই টবে চাষ করা যায় বলে দেশের জনসাধারণকে এই মিষ্টি মরিচ খাওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করা যেতে পারে। 

পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ক্যাপসিকাম উৎপাদন হয়েছে ৪৭৫ টনের মতো। অথচ ২০২১-২২ অর্থবছরে উৎপাদন ছিল দেড়শ টনের কাছাকাছি। 

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে ক্যাপসিকাম চাষ ও উদ্যোক্তা বিষয়ে প্রশিক্ষণ পাওয়া কৃষক মানিক রাজা যশোরের শার্শা ও ঝিকরগাছায় ক্যাপসিকাম চাষ করছেন। 

তিনি বলেন, কয়েক বছর আগে শুরুতে ৬/৭ বিঘা জমিতে ক্যাপসিকাম চাষের জন্য তাদের খরচ হয়েছিল প্রায় ২৪ লাখ টাকা।

তিনি আরও বলেন, একবার পলি হাউজ বা নেটহাউজ হয়ে গেলে পরের বছর আর বেশি খরচ হয় না। আর প্রথম বছর প্রায় ৩৫ লাখ টাকার বিক্রি করেছিলাম। তারপর প্রতি বছর গড়ে ৫০ লাখের মতো আসছে। 

তিনি চলতি বছর প্রায় ১৪ বিঘা জমিতে ক্যাপসিকাম চাষ করেছেন যার মধ্যে হলুদ ক্যাপসিকামই বেশি।

মানিক রাজা বলেন, বাজারে হলুদ ও লাল ক্যাপসিকামের চাহিদা বেশি, মাঠ থেকেই ১৫০ থেকে ২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। সরকার থেকে পলিহাউজ সহ আধুনিক ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন উপকরণ দেওয়া হচ্ছে। 

ক্যাপসিকামের জমিতে ক্যাপসিকাম চাষের গ্যাপ থাকার সময়ে তিনি ধান বুনে নির্দিষ্ট সময় পর চাষ দিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দেন, যা পরে ওই জমিতে জৈবসারের কাজ করে। এছাড়া একই জমিতে টমেটো, ব্রোকলি, রঙিন বাঁধাকপি ও শসার চাষ করে থাকেন।

কৃষি কর্মকর্তা ও কৃষকদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, একটি পরিপক্ব ক্যাপসিকামের ওজন প্রায় আড়াইশো গ্রাম হয়ে থাকে। আবার বাংলাদেশে এটি চাষের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করাটাও খুব কঠিন কিছু নয়; পাশাপাশি উৎপাদন ও দাম বেশি বলে এর প্রতি আগ্রহ বাড়ছে কৃষকের।

প্রতি বছর চাষের পরিমাণ বাড়ছে বলে বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠী এর বীজ আমদানি শুরু করেছে। কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউটও তিন ধরনের বীজ উদ্ভাবন করেছে, যা সরকারি প্রতিষ্ঠান বিএডিসির মাধ্যমে কৃষকদের কাছে পৌঁছানো হচ্ছে। 

তবে এই ফসলটি মূলত নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে যেমন পলিনেট বা গ্রিনহাউজে চাষ করা হয়, যেখানে তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও আলো নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে উন্নত মানের উৎপাদন নিশ্চিত করা সম্ভব। 

তালহা জুবাইর মাসরুর বলেন, রঙিন ক্যাপসিকাম বাংলাদেশের জন্য একটি উচ্চমূল্যের এবং সম্ভাবনাময় ফসল। নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ক্যাপসিকাম চাষ করলে স্বল্প পরিসরের জমিতেও উচ্চ আয় করা সম্ভব।

তিনি বলেন, বর্তমানে দেশে এর চাহিদা দ্রুত বাড়লেও উৎপাদন এখনো সীমিত, ফলে বাজারে একটি বড় ঘাটতি বিদ্যমান এবং আমদানির ওপর নির্ভরতা রয়েছে। এই বাস্তবতা আমাদের জন্য একটি বড় সুযোগ তৈরি করেছে। 

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলছে, নদীর পলি পড়া, সবুজ সারের ব্যবহার এবং নিয়মিত সার ব্যবহারের ফলে প্রতি হেক্টর জমিতে ৩০-৩৫ টন পর্যন্ত ফলন হতে পারে।

অধিদপ্তরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্যাপসিকাম চাষ করে কৃষকেরা প্রতি হেক্টরে সাধারণত ১৪-১৮ লাখ টাকা আয় করেন। তবে ক্যাপসিকাম চাষ বেশ ব্যয় ও কষ্টসাধ্য। এ ফসল আবাদকারী কৃষকেরা সাধারণত মৌসুমজুড়ে মাঠেই পড়ে থাকেন।

এই বিভাগের আরও খবর