যুদ্ধবিরতিতে ‘জয়’ ট্রাম্পের, কিন্তু চোকাতে হবে যেসব মূল্য
ইরানের প্রস্তাব দেওয়া ১০টি দাবির সবকয়টি মেনে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটন ডিসি এই যুদ্ধবিরতিকে নিজেদের ‘জয়’ হিসেবে দেখছে। তবে এখানে থাকছে অনেক যদিকিন্তু। বিশ্লেষকদের মতে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের জয় দেখা হলেও তাকে বহুমূল্য চোকাতে হবে। সামনে হয়ত আরও ভয়াবহ কিছু অপেক্ষা করছে। খবর বিসিবির
ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক লক্ষ্য ‘পূরণ করেছে।’ ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল হয়েছে এবং অনেক শীর্ষ নেতা নিহত হয়েছেন। তবে বাস্তবে অনেক প্রশ্ন রয়ে গেছে। ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের অবস্থান এখনও জানা যায়নি। ধংসও হয়নি। মিসাইল ভাণ্ডারও অজানা। এছাড়া ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের মতো আঞ্চলিক গোষ্ঠীগুলোর ওপর তাদের প্রভাব এখনো আছে।
যদিও ইরানের সঙ্গে শেষমূহুর্তে করা এই চুক্তি ট্রাম্পকে একটি কঠিন সিদ্ধান্ত থেকে সাময়িকভাবে বেরিয়ে আসার সুযোগ দিয়েছে। ট্রাম্পের সামনে দুটি পথ খোলা ছিল—হয় ভয়াবহ হামলা চালানো, নয়তো পিছু হটে নিজের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করা। তবে এটি হয়তো কেবল সাময়িক স্বস্তি।
আগামী দুই সপ্তাহ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান আলোচনা চালাবে। স্থায়ী সমাধানে পৌঁছানোর চেষ্টা করবে। পথটা সহজ হবে না। তবে যুদ্ধবিরতির পর তেলের দাম কয়েক দিনের মধ্যে প্রথমবারের মতো ১০০ ডলারের নিচে নেমেছে এবং মার্কিন শেয়ারবাজারের ফিউচার বেড়েছে। এতে একটা আশাবাদের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। মঙ্গলবার সকালেও এমন অগ্রগতি অনিশ্চিত ছিল।
আগের দিন দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের ভয়াবহ হুমকি ইরানকে চাপ দিয়ে এই যুদ্ধবিরতিতে আনতে সাহায্য করেছে কিনা তা স্পষ্ট নয়। তবে এটি পরিষ্কার যে একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে এমন ভাষা আগে কখনো শোনা যায়নি। এমনকি এই যুদ্ধবিরতি স্থায়ী শান্তিতে পরিণত হলেও, এই যুদ্ধ ও ট্রাম্পের বক্তব্য বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তিকে বড়ভাবে বদলে দিতে পারে।
মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) ট্রাম্পের বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেন মার্কিন ডেমোক্র্যাটরা। কংগ্রেসম্যান জোয়াকুইন কাস্ট্রো বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট নেতৃত্ব দেওয়ার উপযুক্ত নন।’ সিনেটের ডেমোক্র্যাট নেতা চাক স্মাহুমার বলেন, রিপাবলিকানরা যদি যুদ্ধ বন্ধে ভোট না দেয়, তবে তার ফলাফলের দায় তাদেরই নিতে হবে।
ট্রাম্পের নিজ দলের মধ্যেও সবাই তার পাশে দাঁড়াননি। জর্জিয়ার রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান অস্টিন স্কট ট্রাম্পের মন্তব্যকে ‘উল্টো ফলদায়ক’ বলেছেন। উইসকনসিনের সিনেটর রন জনসন সতর্ক করে বলেন, বোমা হামলা চালানো ‘বড় ভুল’ হবে। টেক্সাসের কংগ্রেসম্যান নাথানিয়েল মোরান বলেন, ‘একটি পুরো সভ্যতা ধ্বংস করা আমাদের নীতি নয়।’ আলাস্কার সিনেটর লিসা মুরকাওয়াস্কিও এই হুমকির তীব্র সমালোচনা করেন।
হোয়াইট হাউস দাবি করতে পারে, এই কঠোর অবস্থানই ফল দিয়েছে। জনপ্রিয়তা কমে যাওয়া, দলের ভেতরে সমালোচনা এবং জ্বালানি দামের কারণে অর্থনৈতিক চাপ—সব মিলিয়ে এই যুদ্ধবিরতি ট্রাম্পের জন্য স্বস্তি এনে দিয়েছে। তবে লাভ হয়নি পুরোটা।
ট্রাম্পকে দেওয়া এই পরিকল্পনায় রয়েছে—যুক্তরাষ্ট্রের সেনা প্রত্যাহার, নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া, যুদ্ধক্ষতির ক্ষতিপূরণ দেওয়া এবং হরমুজের নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে রাখা। তবে ট্রাম্প এসব শর্ত মেনে নেবেন—এটা কল্পনা করা কঠিন, যা ভবিষ্যৎ আলোচনাকে জটিল করে তুলতে পারে।
এই মুহূর্তে এটি ট্রাম্পের জন্য আংশিক রাজনৈতিক জয়। কঠোর হুমকি দিয়ে তিনি কাঙ্ক্ষিত ফল পেয়েছেন। তবে এই যুদ্ধবিরতি স্থায়ী সমাধান নয়—এটি কেবল সাময়িক বিরতি। দীর্ঘমেয়াদে এই যুদ্ধ ও ট্রাম্পের বক্তব্যের প্রভাব কী হবে, তা এখনো পুরোপুরি বোঝা যায়নি। হয়ত সামনে এই যুদ্ধবিরতির জন্য ট্রাম্পকে বহুমূল্য চোকাতে হতে পারে!

