উদীয়মান চতুর্থ শক্তি ইরান: হরমুজ প্রণালি ও আগামীর বিশ্বব্যবস্থা
এতদিন ধারণা করা হতো বিশ্বরাজনীতি মূলত যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং রাশিয়া—এই তিনটি শক্তিকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছে। কিন্তু বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি ভিন্ন এক সমীকরণ সামনে নিয়ে এসেছে। অর্থনীতি বা প্রথাগত সামরিক শক্তিতে পিছিয়ে থাকলেও ভৌগোলিক ও কৌশলগত অবস্থানের কারণে 'চতুর্থ বৈশ্বিক শক্তি' হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে ইরান।
বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয় হরমুজ প্রণালি দিয়ে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সাথে সংঘাতের জেরে ইরান এই রুটে আংশিক সামরিক অবরোধ তৈরি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানকে এই প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে না; মাঝে মাঝে দু-একটি জাহাজে হামলা বা হুমকির মাধ্যমেই তারা বিশ্ববাজার নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম। এর ফলে বীমা খরচ বৃদ্ধি ও নিরাপত্তার অভাবে জাহাজ চলাচল ইতিমধ্যে ৯০ শতাংশ কমে গেছে।
বিশ্লেষণ বলা হয়েছে, আধুনিক বিশ্ব অর্থনীতি কেবল তেলের ওপর নয়, বরং এর 'নির্ভরযোগ্য সরবরাহের' ওপর টিকে আছে। যখন এই নির্ভরযোগ্যতা ভেঙে পড়ে, তখন সরবরাহ ব্যবস্থা আর সাধারণ বাজার লেনদেন থাকে না, বরং তা একটি জটিল কৌশলগত সমস্যায় পরিণত হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য প্রতিটি জাহাজকে পাহারা দেওয়া অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও কঠিন। অন্যদিকে, ইরানের জন্য সামান্য ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে পুরো ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে তোলাই যথেষ্ট। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ইতিমধ্যে স্বীকার করেছেন যে, শক্তি প্রয়োগ করে এই পথ খোলা রাখা বাস্তবসম্মত নয়। এটি কেবল ইরানের সাথে সমন্বয়ের মাধ্যমেই সম্ভব।
জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত ও চীনের মতো দেশগুলো তাদের জ্বালানির জন্য এই অঞ্চলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। সরবরাহ বিঘ্নিত হলে দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা বা ‘স্ট্যাগফ্লেশন’ দেখা দিতে পারে, যা ১৯৭০-এর দশকের সংকটের কথা মনে করিয়ে দেয়। এই পরিস্থিতিতে ইরান, রাশিয়া ও চীন—এই তিন শক্তির স্বার্থ মিলে যাচ্ছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
ভবিষ্যতের এক অন্ধকার চিত্র তুলে ধরে বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যদি ইরান (২০ শতাংশ), রাশিয়া (১১ শতাংশ) এবং চীন মিলে একটি জ্বালানি জোট বা কার্টেল তৈরি করে, তবে তারা বিশ্বের প্রায় ৩০ শতাংশ তেল সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করবে। এতে পশ্চিমা বিশ্বের ক্ষমতা দ্রুত হ্রাস পাবে এবং বৈশ্বিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু এই জোটের দিকে ঝুঁকে পড়বে।
সুতরাং যুক্তরাষ্ট্র এখন এক কঠিন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। হয় তাদের দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের ঝুঁকি নিয়ে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করতে হবে, নয়তো ইরানকে একটি বৈশ্বিক শক্তিকেন্দ্র হিসেবে মেনে নিতে হবে। এই যুদ্ধ কেবল একটি আঞ্চলিক সংঘাত নয়, বরং এটি বিশ্বব্যবস্থাকে অপরিবর্তনীয়ভাবে বদলে দেওয়ার এক রূপান্তরমূলক অধ্যায়।

