img

রফতানি বাণিজ্যে বিশেষ অবদানের জন্য সরকার প্রতি বছর বিভিন্ন খাতের রফতানিকারকদের বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বা সিআইপি মর্যাদা দিয়ে থাকেন। ২০১৪ সালের জন্য এমনই ১৬৪ ব্যক্তিকে সরকার সিআইপি মর্যাদা দিয়েছে। তাদের সিআইপি কার্ড দিয়ে সম্মানিত করা হয় গত রোববার রাজধানীর একটি হোটেলে। এদিন এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে ব্যবসায়ীদের হাতে সিআইপি কার্ড তুলে দেন। সাধারণত গার্মেন্টস পণ্য, পাট পণ্য, চামড়াজাত পণ্য, কৃষিজাত পণ্য এবং হিমায়িত মাছ রফতানিকারকরাই সিআইপি কার্ড পাবার ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকেন। কিন্তু কাঁকড়া ও কুঁচে রফতানি করেও যে বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বা সিআইপি মর্যাদা অর্জন করা যায় তা দেখিয়ে দিয়েছেন মেসার্স মিশু এন্টারপ্রাইসের স্বত্বাধিকারী শাহ সূজা মিল্লাত। চীন, তাইওয়ান, হংকং এবং মালয়েশিয়ায় তিনি এখন প্রতিদিন ৪০ থেকে ৪৫ টন কাঁকড়া রফতানি করে দেশকে এনে দিচ্ছেন বৈদেশিক মুদ্রা। সেই সঙ্গে তিনি কুঁচেও রফতানি করছেন এসব দেশে। এই অপ্রচলিত দুই পণ্য রফতানিতে বিশেষ অবদানের জন্যই শাহ সূজাকে সিআইপি মর্যাদা দিয়েছে সরকার।

সিআইপি মর্যাদা অর্জন করায় তিনি রাষ্ট্রের কাছ থেকে বেশ কিছু সুবিধা পাবেন। যেমন সিআইপি কার্ডধারী হিসাবে তিনি সচিবালয়ে প্রবেশে বিশেষ পাস এবং ব্যবসা সংক্রান্ত ভ্রমণে বিমান, রেল, সড়ক ও নৌ-পথে আসনপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবেন। তাছাড়া বিমানবন্দরে ভিআইপি লাউঞ্জ ব্যবহারেরও সুযোগ পাবেন তিনি।

এই অপ্রচলিত পণ্য রফতানির সঙ্গে কিভাবে জড়ালেন-এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের দেশে ১০ শতাংশ মানুষও কাঁকড়া ও কুঁচের ভোক্তা নন। এটি অপ্রচলিত পণ্য। দেশের মানুষ একে ফেলনা হিসেবেই দেখে। কেউ ক্ষেতে চায় না। আর এই ফেলনা পণ্যটিই রফতানি করে আমরা দেশকে বৈদেশিক মুদ্রা এনে দিচ্ছি।

এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত হবার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এক সময় আমি চীন থেকে বিভিন্ন রকমের কসমেটিকস পণ্য আমদানি করতাম। এ জন্য বিমান বন্দরে আমার নিয়মিত আসা-যাওয়া ছিল। ঘটনাটি ২০০৫-০৬ সালের দিকের। শাহজালাল বিমান বন্দরে একদিন হঠাৎ দেখি বক্সে করে কাঁকড়া রফতানি করছেন এক ব্যবসায়ী। তার কাছ থেকে কাঁকড়া রফতানির বিষয়ে খুঁটিনাটি জেনে নিই এবং তাকে দেখেই আমি ঠিক করে ফেলি-আমিও কাঁকড়া রফতানির ব্যবসায় নামবো। খোঁজ-খবর নিয়ে জানতে পারি কাঁকড়া রফতানির বিষয়টি দেখভাল করে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় আর কুঁচে রফতানির বিষয়টি দেখে মৎস্য ও প্রাণী সম্পদ মন্ত্রণালয়। দুই মন্ত্রণালয়ে দৌড়াদৌড়ি করে রফতানির লাইসেন্স নিই। কেবল লাইসেন্স নিলেই হবে না, কাঁকড়া ও কুঁচে রফতানি করতে হলে লাগবে নিজস্ব ঘের বা খামার। এ জন্য ২০০৬ সালে সাতক্ষিরার কালিগঞ্জে আমি ঘের দিই। শুরু হলো আমার স্বপ্নের পথ চলা।

এরপর আমি খুঁজতে শুরু করি বিদেশি ক্রেতা। এ ক্ষেত্রে আমার দিকে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন চীন থেকে আমি যাদের কাছ থেকে কসমেটিকস কিনতাম তারা। তাদের মাধ্যমেই চীনে আমি বেশ কিছু ক্রেতা জোগাড় করলাম। এরপর ২০০৬ সালেই আমি চীনে প্রথম ২ টন কাঁকড়ার চালান পাঠায়। যার আর্থিক মূল্য ছিল ৬ হাজার ডলার। পরে চীনের ক্রেতারাই আমাকে হংকং, তাইওয়ান এবং মালয়েশিয়ার ক্রেতা জোগাড় করে দেয়। এভাবেই শুরু হলো আমার কাঁকড়ার ব্যবসা।

শাহ সূজা বলেন, বর্তমানে ওই চার দেশে তার প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিদিন ৪০ থেকে ৪৫ টন কাঁকড়া রফতানি করা হচ্ছে। এছাড়া কুঁচে কম পাওয়ার কারণে সপ্তাহে দুই দিন সকল রফতানিকারক মিলে ৬৫ টন কুঁচে রতানি করা হয়। অবশ্য প্রতিদিন অন্যান্য ফ্লাইটেও অল্পবেস্তর কুঁচে রফতানি করা হয়। তিনি আরও জানান, এখন দেশ থেকে গড়ে ৪ ডলার প্রতি কেজি মূল্যে কাঁকড়া এবং ৩ ডলার মূল্যে কুঁচে রফতানি করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, এভাবেই দেশের মানুষের ফেলনা পণ্যকে আমরা অপ্রচলিত পণ্য হিসাবে রফতানি করে বৈদেশিক মুদ্রা এনে দেওয়ায় সরকার আমাকে সিআইপি মর্যাদা দিয়েছে। এই মর্যাদা আমার কাছে খুবই সম্মানের। দেশের অনেক বড় বড় ব্যবসায়ীর নামের পাশে আমার মতো ক্ষুদ্র রফতানিকারকের নাম দেখে বেশ ভালোই লেগেছে।

বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের কাঁকড়া ও কুঁচের কেমন চাহিদা রয়েছে এবং এ শিল্পের সম্ভাবনা কেমন রয়েছে-জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের দেশের মানুষ কাঁকড়া ও কুঁচেকে ফেলনা মনে করলেও চীনের মানুষের কাছে কিন্তু এসব খুবই প্রিয় খাবার। আমাদের দেশে যেমন বিয়ে বা অন্য কোনো অনুষ্ঠানে বিশেষ খাবার হিসাবে যেমন পোলাও-মাংশ পরিবেসন করা হয় তেমনি চীনে বিয়ের অনুষ্ঠানে বিশেষ খাবার হিসেবে কাঁকড়া ও কুঁচের খাবার পরিবেসন করা হয়। এতেই বোঝা যায় ওই দেশে এসব পণ্যেও কদর কতো। সুতরাং চীনসহ ওই কয়েকটি দেশে বাংলাদেশের কাঁকড়া ও কুঁচের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। আর চাহিদা রয়েছে বলেই এ শিল্পের সামনে অপার সম্ভাবনা রয়েছে।

শাহ সূজা বলেন, এই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে এ শিল্পের দিকে সরকারকে নেক নজর দিতে হবে। এ খাতের উদ্যোক্তাদের নিজস্ব জমি নেই। সাধারণত অন্যের জমিতে কাঁকড়া ও কুঁচে চাষ করা হয়। সরকার যদি এ খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য আলাদা জোন করে দেয় তা হলে আমাদের জন্য ভালো হতো। তাছাড়া স্বল্প সুদে ঋণসহ আরও কিছু সহযোগিতা দরকার আমাদের। এসব সহযোগিতা পেলে এ খাত থেকে রফতানি আয় তিনগুন করা যাবে।

এই বিভাগের আরও খবর


সর্বশেষ