নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার: সংসদকে প্রধানমন্ত্রী
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতীয় সংসদে বিএনপি ঘোষিত নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নে আগামী ১৮০ দিন, আগামী অর্থবছর এবং আগামী ৫ বছরের কর্মপরিকল্পনার রূপরেখা তুলে ধরেছেন। একইসঙ্গে ইশতেহার বাস্তবায়নে ইতোমধ্যে অর্জিত উল্লেখযোগ্য অগ্রগতিও দেশবাসীর সামনে উপস্থাপন করেন তিনি।
বুধবার (১ এপ্রিল) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ষষ্ঠ দিনে সিলেট-২ আসনের সংসদ সদস্য মোছা. তাহসিনা রুশদীর এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এসব তথ্য জানান।
দিনের কর্মসূচি অনুযায়ী প্রথম ত্রিশ মিনিট প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত এই প্রশ্নোত্তর পর্বে তাহসিনা রুশদীর উত্থাপিত প্রথম প্রশ্নটি ছিল- সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারে ঘোষিত বিভিন্ন কার্যক্রমের কী কী অগ্রগতি সাধিত হয়েছে?
তার প্রশ্নের জবাব দিতে উঠে দাঁড়াতেই সরকারি দলের সদস্যরা টেবিল চাপড়িয়ে প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানান। এ সময় বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানসহ বিরোধী সদস্যরাও সরকারি দলের সদস্যদের সঙ্গে তাল মেলান।
তাহসিনা রুশদীকে ধন্যবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারে ঘোষিত কার্যক্রমসমূহ বাস্তবায়নের জন্য সকল মন্ত্রণালয় আগামী ১৮০ দিন, আগামী অর্থবছর এবং আগামী ৫ বছরের কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করছে। ইতোমধ্যে নির্বাচনি ইশতেহারে ঘোষিত কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘প্রান্তিক ও নিম্নআয়ের পরিবারকে সুরক্ষা দিতে প্রাথমিক পর্যায়ে ১৩টি জেলার ১৫টি ওয়ার্ডে ৩৭,৮১৪ টি নারীপ্রধান পরিবারকে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রদান কার্যক্রম শুরু হয়েছে।’
কৃষকের সার্বিক সুরক্ষা প্রদানে সরকার কৃষক কার্ড প্রদানের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘প্রাথমিক পর্যায়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে ০৮টি বিভাগের ১০টি জেলার ১১টি উপজেলার ১১টি ব্লকে পাইলটিং করা হবে। এছাড়া, নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকার ইতোমধ্যে শস্য, ফসল, পশুপালন ও মৎস্য খাতে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করেছে।’
ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেম, পুরোহিতদের সম্মানী দেয়া হয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নে প্রাথমিক পর্যায়ে ইদুল ফিতরের পূর্বেই ৩২৯৫ জন ইমাম, ২৯৭৫ জন মুয়াজ্জিন, ২৬০৪ জন খাদেম এবং হিন্দু মন্দিরের ১১৪ জন পুরোহিত, ৮৩ জন সেবাইত, বৌদ্ধ বিহার, প্যাগোডার ১৫ জন অধ্যক্ষ ও ১৬ জন উপাধ্যক্ষসহ সর্বমোট ৯১০২ (নয় হাজার একশত দুই)জন উপকারভোগীর ব্যাংক একাউন্টে সম্মানী প্রেরণ করা হয়েছে।’
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘ই-হেলথ কার্ড প্রদান’ বিষয়ে পাইলটিং কার্যক্রমের আওতায় খুলনা জেলায় ২৫ লাখ ই-হেলথ্ কার্ড প্রদানের জন্য একটি প্রকল্প অনুমোদনের প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।’
২০ হাজার কিমি খাল খনন ও বনায়ন কর্মসূচির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী আগামী ৫ বছরে ২০,০০০ কি.মি. খাল খনন,পুনঃখনন কর্মসূচি গত ১৬ মার্চ, ২০২৬ হতে বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। জুন ২০২৬ পর্যন্ত পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ ও কৃষি মন্ত্রণালয় ১২০৪ কিলোমিটার খাল খনন, পুনঃখনন করবে। এছাড়া, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় কর্তৃক জুন ২০২৬ পর্যন্ত কাবিখা (কাজের বিনিময়ে খাদ্য), কাবিটা (কাজের বিনিময়ে টাকা), টিআর (টেস্ট রিলিফ)-এর মাধ্যমে ১৫০০ কিলোমিটার খাল পুনঃখনন, সংস্কার করা হবে।’
বৃক্ষরোপণ ও সবুজ কর্মসংস্থানের বিষয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ ও সবুজ কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বনায়ন সৃজনের জন্য ইতোমধ্যে ১ কোটি ৫০ লক্ষ বিভিন্ন প্রজাতির চারা উৎপাদন করা হয়েছে। উৎপাদিত চারাসমূহ চলতি বছর আসন্ন বর্ষা মৌসুমে রোপণ করা হবে।’
এ অর্থবছরেই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২ লাখ শিশুর মাঝে বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস বিতরণের পরিকল্পনা রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘কারিগরি ও ভাষা দক্ষতা উন্নয়নে আগামী ১৮০ দিনের মধ্যে কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৯ হাজার শিক্ষককে ট্যাব প্রদান করা হবে, ৩৮৩২টি মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন করা হবে এবং ১৭২ জন শিক্ষার্থীকে ইটালিয়ান ও জাপানিজ ভাষা শিক্ষা প্রদান করা হবে। ৪১৮টি কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জুন, ২০২৬ এর মধ্যে ফ্রি ওয়াই-ফাই চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।’
এমনকি সারাদেশে শহর ও গ্রাম অঞ্চলে খেলার মাঠ নির্ধারণ ও অবকাঠামো উন্নয়নে কর্মকৌশল নির্ধারণে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে।
হাই-টেক, সফটওয়্যার পার্ক ও আইসিটি সেন্টারসমূহ কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য এবং বাংলাদেশে চধুঢ়ধষ-এর কার্যক্রম আরম্ভে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
নির্বাচনি ইশতেহারকে প্রাধান্য দিয়ে বেতন কাঠামোর আওতায় জাতীয় ক্রীড়াবিদদের জন্য ‘ক্রীড়া ভাতা’ চালু করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ৫০০ জন ক্রীড়াবিদকে এই ভাতার আওতায় আনার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে যার মধ্যে প্রথম ধাপে ১২৯ জন আন্তর্জাতিক বিষয়ে সাফল্য অর্জনকারী ক্রীড়াবিদকে ভাতা প্রদান করা হয়েছে।
ল্যাংগুয়েজ স্টুডেন্ট ভিসায় বিদ্যমান জামানতবিহীন ঋণ সীমা ০৩ লক্ষ হতে ১০ লক্ষ টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। জাপানগামী শিক্ষার্থীদের জন্য ভিসা প্রাপ্তির পূর্বেই Certificate of Eligibility (CoE)-এর ভিত্তিতে এ ঋণ প্রদান সহজীকরণ করা হয়েছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
সম্পূরক প্রশ্ন হিসেবে তাহসিনা রুশদী প্রধানমন্ত্রীর কাছে জানতে চান ‘কৃষক কার্ড’ কবে থেকে প্রদান করা হবে?
এই প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, পাইলট কর্মসূচির অংশ হিসেবে কৃষক কার্ড ইনশাআল্লাহ আগীম ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখে প্রদান করা হবে। ইতোমধ্যে আমরা ২২ হাজার কৃষককে এই পাইলট প্রকল্পের আওতায় নিয়ে এসেছি। বাংলাদেশের ১০ টি জেলায় এই কর্মসূচি শুরু করতে যাচ্ছি। পর্যায়ক্রমিকভাবে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে সকল কৃষকের কাছে এই কার্ড পৌঁছানোর পরিকল্পনা আমাদের সরকারের রয়েছে।
এর আগে আজ বুধবার বিকাল ৩টায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অধিবেশনে শুরু হয়।
জাতীয় সংসদে তারেক রহমান এই প্রথম প্রশ্নোত্তর পর্বে অংশ নিলেন। তাহসিনা রুশদীর ছাড়াও সরকার ও বিরোধীদলীয় কয়েকজন সদস্য প্রশ্ন উত্থাপন করেন।
তাদের মধ্যে আছেন পটুয়াখালী-৪ আসনের এ বি এম মোশাররফ হোসেন, কুমিল্লা-৯ আসনের আবুল কালাম, ঢাকা-১৯ আসনের দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন, কুড়িগ্রাম-২ আসনের আতিকুর রহমান মোজাহিদ ও নরিসংদী-৫ আসনের মো. আশরাফ উদ্দিন।
ভিভিআইপি লাউঞ্জে বসে প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্ব দেখেন প্রধানমন্ত্রীর কন্যা জাইমা রহমান।
এর আগে প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্ব নির্দিষ্ট দিনে আয়োজনের প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। আজ সংসদের মুলতবি অধিবেশনে বক্তব্যকালে একজন সংসদ সদস্য এ প্রস্তাব উত্থাপন করেন।
সপ্তাহের একটি নির্দিষ্ট দিন বিশেষ করে বুধবার প্রধানমন্ত্রীর জন্য বরাদ্দ রাখা হলে সংসদীয় কার্যক্রম আরও সুসংগঠিত হবে বলে প্রস্তাবে উল্লেখ করেছেন ওই সংসদ সদস্য।
স্পিকার মেজর (অবসরপ্রাপ্ত) হাফিজ উদ্দিন আহমদ এ বিষয়ে প্রশ্নটি রেফার করার নির্দেশ দেন এবং পরবর্তীতে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান।

