মান্দারিনের চাপে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে উইঘুর ভাষা
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস (২১ ফেব্রুয়ারি), যা ইউনেস্কোর ঘোষণায় বিশ্বব্যাপী পালিত হয়, ভাষাগত বৈচিত্র্য ও সাংস্কৃতিক অধিকারের প্রশ্নকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
এই প্রেক্ষাপটে পূর্ব তুর্কিস্তান (শিনজিয়াং) অঞ্চলে উইঘুর শিক্ষার্থীদের ওপর প্রভাব ফেলছে এমন শিক্ষানীতি নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বিগ নিউজ নেটওয়ার্কে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, স্থানীয় বাসিন্দাদের শেয়ার করা একটি ভিডিওতে অভিযোগ করা হয়েছে উইঘুর শিক্ষার্থীদের ক্রমেই মান্দারিন-নির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থায় স্থানান্তর করা হচ্ছে, যেখানে মাতৃভাষায় পাঠদানের সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত বা সম্পূর্ণ বাতিল করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, এটি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থা থেকে উইঘুর ভাষাকে ধাপে ধাপে সরিয়ে দেওয়ার এক সুসংগঠিত প্রক্রিয়া।
ভিডিওতে কথা বলা এক শিক্ষার্থীর ভাষ্য অনুযায়ী, মাতৃভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি সংস্কৃতি, ইতিহাস ও সামষ্টিক স্মৃতির ধারক। মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগ হ্রাস পেলে আত্মপরিচয় ও সামাজিক সংযোগের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে এমন আশঙ্কা প্রকাশ করা হয় প্রতিবেদনে।
আন্তর্জাতিক সংস্থা জেনোসাইড ওয়াচ-এর উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনা কমিউনিস্ট পার্টি (সিসিপি) উইঘুর জনগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় চর্চাকে হান চীনা সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রীয় মতাদর্শের সঙ্গে একীভূত করার নীতি অনুসরণ করছে।
সংগঠনটির দাবি, স্থানীয় সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সিসিপি-নিয়ন্ত্রিত কাঠামোয় রূপান্তরিত করার মাধ্যমে সম্প্রদায়টির স্বাতন্ত্র্য ক্ষয়িষ্ণু করা হচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৯০-এর দশক থেকে ‘বিগ ডেভেলপমেন্ট অব দ্য নর্থওয়েস্ট প্ল্যান’-এর আওতায় বিপুলসংখ্যক হান চীনাকে শিনজিয়াং অঞ্চলে পুনর্বাসন করা হয়, যা জনমিতিক ভারসাম্যে পরিবর্তন আনে বলে সমালোচকদের দাবি।
একই সঙ্গে ২০১৭ সাল থেকে আনুমানিক ৮ লাখ থেকে ২০ লাখ উইঘুরকে বিভিন্ন আটক বা ‘পুনঃশিক্ষা’ কেন্দ্রে রাখা হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর বক্তব্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
জেনোসাইড ওয়াচের তথ্য অনুযায়ী, এসব কেন্দ্রে রাজনৈতিক দীক্ষা, মতাদর্শগত পুনর্গঠন, ধর্মীয় চর্চা সীমিতকরণ এবং ভাষা ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপের অভিযোগ রয়েছে। অনেক মসজিদ ধ্বংস বা সীমিত ব্যবহারের আওতায় আনা হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
চীনা কর্তৃপক্ষ অবশ্য এসব পদক্ষেপকে ‘সন্ত্রাসবিরোধী’ ও ‘চরমপন্থা দমন’ উদ্যোগ হিসেবে বর্ণনা করে আসছে। তবে সমালোচক ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, নীতির প্রয়োগে একটি নির্দিষ্ট জাতিগত ও ধর্মীয় জনগোষ্ঠী লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।
ইতিহাসগতভাবে, ১৯৯৭ সালে ঐতিহ্যবাহী উইঘুর উৎসব নিষিদ্ধ করার পর প্রতিবাদ দমনে সহিংসতা এবং ২০০৯ সালে উরুমকিতে জাতিগত সংঘর্ষ যাতে অন্তত ২০০ জন নিহত হন এই অঞ্চলের উত্তেজনাপূর্ণ প্রেক্ষাপটকে আরও জটিল করে তোলে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
বর্তমানে শিনজিয়াং অঞ্চলকে বিশ্বের অন্যতম নিবিড় নজরদারির আওতাধীন এলাকা হিসেবে বর্ণনা করা হয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর নজরদারি, বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ এবং বিস্তৃত নিরাপত্তা অবকাঠামোর মাধ্যমে নাগরিকদের চলাচল ও সামাজিক আচরণ পর্যবেক্ষণের অভিযোগ রয়েছে।
ভাষা ও শিক্ষানীতি নিয়ে এই বিতর্ক আন্তর্জাতিক পরিসরে সাংস্কৃতিক অধিকার, পরিচয় ও মানবাধিকারের প্রশ্নকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের তাৎপর্য তাই এখানে প্রতীকী ভাষাগত বহুত্ব রক্ষার অঙ্গীকার বাস্তবে কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

