তুরস্ককে কেন ইরানের চেয়েও বিপজ্জনক মনে করছে ইসরাইল
পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর অন্যতম প্রভাবশালী সদস্য তুরস্ক। দেশটির সঙ্গে আমেরিকা ও ইউরোপের দেশগুলোর সম্পর্কও বেশ উষ্ণ। তবে রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান নেতৃত্বাধীন দেশটিকে হুমকি মনে করছে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ট মিত্র ইসরাইল। শুধু তাই নয়, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ইহুদিবাদী ভূখণ্ডটি যতটানা ঝুঁকিপূর্ণ মনে করে তার চেয়েও বেশি উদ্বিগ্ন আঙ্কারাকে নিয়ে।
ইসরাইলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট, যিনি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আগামী সাধারণ নির্বাচনে অংশ নেবেন, তিনি সম্প্রতি বলেন, কাতারের সমর্থনে তুরস্ক ইরানকে হটিয়ে ইসরাইলের প্রধান কৌশলগত হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। তার এই কথা কেবল অন্য কোনো শত্রু সম্পর্কে সাধারণ সতর্কবার্তা নয়। বরং, তার এ মন্তব্য একটি গভীর উদ্বেগের প্রতিফলন: ইসরাইল হয়তো এমন একজন শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ প্রতিপক্ষের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে, যার একটি ঐতিহাসিক তাৎপর্যও আছে।
কয়েক দশক ধরে ইসরাইলের নিরাপত্তা উদ্বেগের মূলে ছিল ইরান এবং তার শিয়া অক্ষ—যার মধ্যে আছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, হিজবুল্লাহর ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার এবং সিরিয়া ও লেবাননের অঘোষিত যুদ্ধ। কিন্তু বেনেটের কথাগুলো একটি নতুন অক্ষের ইঙ্গিত দেয়: তুরস্ক—যা ন্যাটোর সদস্য এবং যার আছে এক সমৃদ্ধ অর্থনীতি ও বৈশ্বিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা। আঙ্কারা একটি সুন্নি অক্ষ তৈরি করছে, যা ইরানের শিয়া অক্ষের চেয়েও শক্তিশালী হতে পারে।
আন্তর্জাতিক রাজনীতির তুর্কি বিশেষজ্ঞ মেলিহা আলতুনিসিক বলেন, এরদোয়ান একজন বিচক্ষণ অভিনেতা, যিনি বোঝেন কীভাবে আদর্শকে শক্তিতে রূপান্তর করতে হয়। ইরানের বিপরীতে তুরস্ক বাস্তববাদ বা প্র্যাগম্যাটিজমের সঙ্গে আদর্শের সমন্বয় ঘটায়, যা দেশটিকে একই সঙ্গে বিশ্বাসযোগ্য এবং অভাবনীয় করে তোলে।
নতুন অক্ষের কলাকৌশল
ইসরাইলি কৌশলবিদদের দৃষ্টিতে এই হুমকি কেবল তুরস্ক নয়, বরং তুরস্ক ও কাতার। এই দুই দেশের বিরুদ্ধে ‘মুসলিম ব্রাদারহুড দানবকে লালন-পালন’ করার এবং শিয়াদের প্রতি ইরানের সমর্থনের মতো একই ধরণের আদর্শিক হুমকি ছড়ানোর অভিযোগ তোলা হয়েছে। সিরিয়া ও গাজায় তাদের প্রভাব বাড়ছে, এমনকি ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়া থেকে সৌদি আরবকে দূরে সরিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টার গুঞ্জনও আছে। সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি হতে পারে: তুরস্ক, কাতার ও তাদের পারমাণবিক শক্তিধর মিত্র পাকিস্তানকে নিয়ে গঠিত একটি নতুন শত্রু অক্ষ।
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস-এর বিশেষজ্ঞ স্টিভেন কুক যেমনটা লিখেছেন, ইসরাইল দীর্ঘকাল ধরে ইরানের সক্ষমতা অনুযায়ী তার প্রতিরক্ষা কৌশল সাজিয়েছে। কিন্তু তুরস্ক যদি সৌদি আরবকে পাশে পেতে সফল হয় বা পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করে, তবে কৌশলগত মানচিত্র রাতারাতি বদলে যাবে। তখন এটি কেবল ইরান থেকে আসা ক্ষেপণাস্ত্রের বিষয় থাকবে না—এটি হবে পারমাণবিক সক্ষমতা সম্পন্ন একটি সুন্নি বিশ্ব।
অর্থনৈতিক যুদ্ধ
ইসরাইল ও তুরস্কের মধ্যকার এই দ্বন্দ্ব কেবল আদর্শিক বা সামরিক নয়, বরং অর্থনৈতিকও। ২০২৪ সালের মে মাসে তুরস্ক ইসরাইলের সঙ্গে আমদানি-রপ্তানিসহ সব বাণিজ্য লেনদেন স্থগিত করে পূর্ণাঙ্গ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর আগে সিমেন্ট, অ্যালুমিনিয়াম ও সারসহ ৫৪টি পণ্য গোষ্ঠীর ওপর বাণিজ্য সীমাবদ্ধ করা হয়েছিল। ইসরাইলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসরাইল কাটজ বলেছিলেন যে, এরদোয়ান ‘হামাসকে সমর্থনের জন্য তার দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ বিসর্জন দিচ্ছেন।’
ইসরাইলের জন্য এই বয়কট কেবল একটি বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা নয়, বরং এটি একটি সতর্কবার্তা যে তুরস্ক অর্থনৈতিক শক্তি প্রয়োগ করতে ভয় পায় না। তুরস্ক একটি জি২০ ভুক্ত দেশ এবং ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার দেশগুলোর ওপর এর অর্থনৈতিক প্রভাব আছে। বাণিজ্য বিশ্লেষক সানি ম্যান বলেন, তুরস্ক এই প্রথম সম্পূর্ণ রাজনৈতিক কারণে অন্য একটি দেশের বিরুদ্ধে ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করল। এটি তুরস্কের অর্থনৈতিক শক্তির গভীরতাকে নির্দেশ করে।
ঐতিহাসিক অনুরণন
এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটও আছে। ১৯১৭ সাল পর্যন্ত ফিলিস্তিন অটোমান শাসনের অধীনে ছিল। তাই এখানে এক ধরণের পরিচিতি ও দায়বদ্ধতা আছে। এরদোগান তার বক্তৃতায় প্রায়শই অটোমান প্রতীক ব্যবহার করেন এবং তুরস্ককে মুসলিম ভূখণ্ডের রক্ষাকর্তা হিসেবে চিত্রিত করেন।
অ্যারিয়েল ইউনিভার্সিটির ড. আসা ওফির বলেন, এখানে একটি ঐতিহাসিক স্মৃতি কাজ করছে। তুরস্কের অনেকের কাছে ফিলিস্তিন ইস্যুটি কেবল সংহতির বিষয় নয়; এটি একটি উত্তরাধিকারের বিষয়।
এই ঐতিহাসিক গুরুত্ব ইসরাইলের ভয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। ইরানের শিয়া আদর্শ অধিকাংশ আরবের কাছে অপরিচিত হলেও, তুরস্ক এই অঞ্চলে সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক বৈধতা দাবি করতে পারে। তুরস্কের অটোমান ঐতিহ্য এরদোগানের বক্তব্যের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ায়, যাতে ইরানের মতো বৈপ্লবিক স্লোগানের অভাব নেই।
সতর্কবার্তা নাকি উস্কানি
প্রশ্ন হলো, ইসরাইলের এই সতর্কবার্তা কি একটি প্রকৃত মূল্যায়ন নাকি উস্কানি? কিছু ইসরাইলি পণ্ডিত একে শত্রুতার এক নতুন পর্যায়ের প্রস্তুতি হিসেবে দেখছেন, যা তুর্কি সম্প্রসারণবাদের বিরুদ্ধে আগাম ব্যবস্থা নিতে ব্যবহৃত হতে পারে। আবার কেউ কেউ মনে করেন, তুরস্কের হুমকিকে বাড়িয়ে দেখা দেশটিকে একটি প্রতিকূল জোটের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
আলতুনিসিক লিখেছেন, তুরস্ককে ‘নতুন ইরান’ হিসেবে দেখা এক ধরণের কৌশলগত ভুল হিসাব। এটি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বদলে সংঘাতকে ত্বরান্বিত করতে পারে।
মোশে দায়ান সেন্টারের জোনাথন ঘারিয়ানি যুক্তি দেন যে, ইসরাইল ও তুরস্কের সম্পর্ক সবসময়ই সহযোগিতা এবং সংঘাতের মধ্যে দোলায়মান। ৭ অক্টোবরের পরবর্তী যুগ উত্তেজনাকে তীব্র করেছে, তবে এটি নজিরবিহীন নয়। ৯০-এর দশকে সামরিক সহযোগিতা দেখা গিয়েছিল; আজ অর্থনৈতিক যুদ্ধ চলছে। পরিস্থিতির পরিবর্তন হচ্ছে, কিন্তু এখন ঝুঁকি অনেক বেশি।
একজন বিশ্বাসযোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বীর ভয়
শেষ পর্যন্ত, তুরস্ককে ইসরাইলের ‘পরবর্তী ইরান’ হিসেবে দেখার পেছনে কেবল অবরুদ্ধ হওয়ার ভয় নেই, বরং এমন একজন প্রতিদ্বন্দ্বীর ভয় আছে যে একই সঙ্গে বিশ্বাসযোগ্য, সমৃদ্ধ ও সমৃদ্ধ ইতিহাসের অধিকারী। ইরান একটি বিপজ্জনক শত্রু, কিন্তু বিচ্ছিন্ন। অন্যদিকে, তুরস্ক বিপজ্জনক কিন্তু বিশ্বব্যবস্থার সঙ্গে একীভূত। ইরান বৈপ্লবিক কিন্তু নিষেধাজ্ঞার কবলে। তুরস্ক একজন বাস্তববাদী শত্রু ও বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু।
বেনেটের বক্তব্য সতর্কবার্তা হোক বা উস্কানি, এটি একটি বড় সত্যকে তুলে ধরে। ইসরাইল এখন কেবল শত্রুদের শত্রুতা নয়, বরং তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও ভীত। এই বাস্তবতা পরীক্ষা করবে যে জেরুসালেমের নীতিনির্ধারকরা কোনো তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বাগাড়ম্বর ও বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্য করতে পারেন কি না। এটি এমন এক বাস্তবতা যা মধ্যপ্রাচ্যকে আবার সংঘাতের আবর্তে আটকে রাখতে পারে, যেখানে এবার তুরস্ক হবে মূল কেন্দ্রবিন্দু।

