img

সচিবালয়ে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব গ্রহণের পর বুধবার প্রথমদিন কথা বলছিলেন আমিনুল হক, তার চোখে তখন একসঙ্গে দেখা যাচ্ছিল অতীতের মাঠ, বর্তমানের দায়িত্ব আর ভবিষ্যতের স্বপ্ন। কথা বলছিলেন তিনি প্রশাসনিক ভাষায় নয়, একজন খেলোয়াড়ের হৃদয় দিয়ে, গভীর অনুভূতি দিয়ে। নতুন দায়িত্ব, নতুন পথচলা। আমিনুল হকের একটাই বার্তা-তিনি বদলাননি, বদলাবেনও না। মাঠের সেই পরিচিত গোলরক্ষকের মতোই এখন দায়িত্বের পোস্টে দাঁড়িয়ে দেশের ক্রীড়াঙ্গনকে এগিয়ে নেওয়াই তার লক্ষ্য। দেশের ক্রীড়াঙ্গনের অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রতিভা বিকাশ, গ্রাসরুট পর্যায়ে খেলাধুলা ছড়িয়ে দেওয়া-সব কিছু নিয়েই তার ভাবনা।

নবনিযুক্ত যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক দায়িত্ব গ্রহণের পর দেশের ক্রীড়াঙ্গন নিয়ে তার পরিকল্পনা, চ্যালেঞ্জ ও অগ্রাধিকারের কথা জানিয়েছেন। শুরুতেই কৃতজ্ঞতার সুরে তিনি বলেন, ‘মহান আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ, যিনি আমাকে এই দায়িত্ব দিয়েছেন। খেলোয়াড় হিসাবে মাঠ আমাকে যে শিক্ষা দিয়েছে-শৃঙ্খলা, ধৈর্য, লড়াই আর স্বপ্ন, আজ সেই শিক্ষাই দেশের ক্রীড়াঙ্গন গড়ার শক্তি হয়ে উঠেছে।’ তার কণ্ঠে ছিল দীর্ঘ পথচলার স্মৃতি-গোলপোস্টের সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিপক্ষের আক্রমণ ঠেকানো, পরাজয়ের কষ্ট গিলে আবার উঠে দাঁড়ানো আর বিজয়ের মুহূর্তে দেশের পতাকা বুকে জড়িয়ে ধরা। সেই স্মৃতিগুলোই আজ তার নীতিনির্ধারণের ভিত।

আমিনুলের কথায় বারবার ফিরে আসে একটি শব্দ-নিরাপত্তা।

তিনি চান, খেলোয়াড়ের জীবন শুধু মাঠে যেন আটকে না থাকে; তার পরিবার, ভবিষ্যৎ ও সম্মান-সব যেন নিশ্চিত হয়। তিনি বলেন, ‘আমরা চাই খেলোয়াড়রা যেন জীবনের অনিশ্চয়তা নিয়ে খেলতে না নামে। খেলাধুলা হবে একটি সম্মানজনক পেশা, যেখানে পরিবারও নিশ্চিন্তে থাকবে।’ নিজের শৈশবের অভিজ্ঞতা স্মরণ করে তিনি জানান, কত প্রতিভাবান তরুণ শুধু আর্থিক অসুবিধার কারণে হারিয়ে গেছে। সেই হারিয়ে যাওয়া সম্ভাবনাগুলো ফিরিয়ে আনতেই বিভাগীয় পর্যায়ে প্রশিক্ষণ বিস্তার এবং বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের (বিকেএসপি) সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। শিশুদের জীবনে খেলাধুলা-শরীরের চেয়েও বড় শিক্ষা। আমিনুল হকের বিশ্বাস, ‘খেলাধুলা শুধু দৌড়ানো বা জেতা নয়, এটি মানুষ গড়ে। তাই প্রাথমিক স্তর থেকেই খেলাধুলাকে বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা। তার ভাষায়, ‘খেলাধুলা শিশুদের শেখায় হারতে, আবার জিততেও। শেখায় নেতৃত্ব, সহনশীলতা, আত্মবিশ্বাস, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে যা প্রয়োজন।’

প্রতিটি উপজেলায় ক্রীড়া কর্মকর্তা ও প্রশিক্ষকের মাধ্যমে একটি সংগঠিত কাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা ইতোমধ্যে নেওয়া হয়েছে। ঢাকার মতো ব্যস্ত নগরীতে খেলার মাঠের সংকট তিনি দেখেন শুধু অবকাঠামোগত সমস্যা হিসাবে নয়, সামাজিক সংকট হিসাবেও। তিনি বলেন, ‘মাঠ শুধু খেলা নয়, শিশুদের হাসি, তরুণদের স্বপ্ন, আর প্রবীণদের হাঁটার জায়গাও। আমরা চাই প্রতিটি মাঠ হোক কমিউনিটির প্রাণ।’

তার পরিকল্পনায় প্রতিটি মাঠ হবে মানুষের মিলনস্থল-যেখানে শরীরের পাশাপাশি মনও সুস্থ হবে। একজন সাবেক খেলোয়াড় হিসাবে তিনি জানেন, ক্যারিয়ার শেষ হওয়ার পরের শূন্যতা কতটা কঠিন। তাই সাবেক খেলোয়াড়দের কর্মসংস্থান, বেতন কাঠামো ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগকে তিনি ব্যক্তিগত দায়িত্ব হিসাবেই দেখেন। ‘যারা দেশের জন্য খেলেছে, তাদের জীবন যেন কখনো অনিশ্চয়তায় না কাটে,’ এটাই তার অঙ্গীকার।

নারী খেলোয়াড়দের প্রসঙ্গে তার কণ্ঠে গর্ব স্পষ্ট। সাবেক এই গোলকিপার বলেন, দেশের মেয়েরা ইতোমধ্যেই প্রমাণ করেছে, সুযোগ পেলে তারা বিশ্বমঞ্চে উজ্জ্বল হতে পারে। তাই সমান সুযোগ, প্রশিক্ষণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। স্পোর্টস শিল্প তার দৃষ্টিতে অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনা। তার ভাবনা শুধু মাঠকেন্দ্রিক নয়, অর্থনীতিতেও বিস্তৃত। দেশীয় ক্রীড়া সরঞ্জাম উৎপাদন ও আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির মাধ্যমে একটি শক্তিশালী স্পোর্টস শিল্প গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে তার।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও খেলাধুলাকে তিনি দেখেন সেতুবন্ধন হিসাবে। সংলাপ, সহযোগিতা ও পারস্পরিক সম্মানের মাধ্যমে ক্রীড়া উন্নয়নের পথ তৈরি করতে চান তিনি। সুশাসন উন্নয়নের ভিত্তি। ফেডারেশনগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনা, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং সবাইকে একসঙ্গে নিয়ে কাজ করা-এই তিনটিকে তিনি উন্নয়নের মূল শর্ত হিসাবে দেখেন। ফুটবল তার হৃদয়ের সবচেয়ে কাছে। ফুটবল তার পরিচয়, আবেগ, তার শিকড়। দীর্ঘদিন আন্তর্জাতিক সাফল্যের অভাব তাকে কষ্ট দেয়; কিন্তু হতাশ করে না। তিনি বিশ্বাস করেন, পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ ও খেলোয়াড়দের কল্যাণ নিশ্চিত করলে সাফল্য ফিরবেই।

সাক্ষাৎকারের শেষ দিকে ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর কণ্ঠে ছিল দৃঢ়তা, ‘আমরা শুধু খেলা আয়োজন করব না। আমরা মানুষ ও ভবিষ্যৎ গড়ব। খেলোয়াড়রা যেন ভয় নয়, গর্ব নিয়ে দেশের জার্সি পরে-সেই পরিবেশ তৈরি করাই আমাদের লক্ষ্য।’

এই বিভাগের আরও খবর