img

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো তরুণ প্রজন্মকে আকর্ষণে ব্যাপক প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। বিশেষ করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বেকার ভাতা এবং উচ্চশিক্ষার জন্য সুদমুক্ত ঋণের মতো বিষয়গুলো এখন নির্বাচনী প্রচারণার কেন্দ্রবিন্দুতে। 

তবে এই বিশাল অঙ্কের অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন করা এবং দেশের বর্তমান ভঙ্গুর অর্থনীতির সাথে তার সামঞ্জস্য রক্ষা করা কতটুকু সম্ভব, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে সংশয় দেখা দিয়েছে।

কর্মসংস্থান ও বেকারত্বের পরিসংখ্যান 

২০২৪ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে স্নাতক ডিগ্রিধারী তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১৩.৫ শতাংশ, যা সংখ্যার হিসেবে প্রায় ৮ লাখ ৮৫ হাজার। সামগ্রিক বেকারত্ব ৪.৬৩ শতাংশ হলেও শিক্ষিত যুবকদের কর্মসংস্থানের অভাবই দেশের বড় সংকট। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ক্ষমতায় আসার ১৮ মাসের মধ্যে ১০ মিলিয়ন (১ কোটি) কর্মসংস্থান তৈরির অঙ্গীকার করেছে। 

অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী ৫ বছরে ১০ মিলিয়ন যুবককে কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে তোলার পাশাপাশি ৫ মিলিয়ন কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা দিচ্ছে।

আর্থিক সহায়তা ও কার্ডভিত্তিক জনকল্যাণ 

উভয় জোটই ভোটারদের কার্ডভিত্তিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। বিএনপির প্রধান আকর্ষণ 'ফ্যামিলি কার্ড', যার মাধ্যমে শুরুতে ৪০ লাখ পরিবারকে মাসিক ২,০০০ থেকে ২,৫০০ টাকা বা সমমূল্যের নিত্যপণ্য দেওয়া হবে। অন্যদিকে জামায়াত প্রস্তাব করেছে একটি 'স্মার্ট সোশ্যাল সিকিউরিটি কার্ড', যা নাগরিকের এনআইডি, স্বাস্থ্য ও কর ব্যবস্থার সাথে যুক্ত থাকবে। 

তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমানে সামাজিক সুরক্ষা খাতে জিডিপির মাত্র ২ শতাংশ ব্যয় করা হয়। বিএনপির এই একটি প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে হলে এই খাতের বাজেট প্রায় দ্বিগুণ করতে হবে, যা বর্তমান রাজস্ব পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত দুরুহ।

\

শিক্ষা ও ঋণের হাতছানি 

শিক্ষিত বেকারদের জন্য জামায়াত মাসে ১০,০০০ টাকা পর্যন্ত সুদমুক্ত ঋণের প্রস্তাব দিয়েছে, যা তারা কর্মসংস্থান হওয়ার পর পরিশোধ করবে। এছাড়াও শীর্ষ ১০০ শিক্ষার্থীকে হার্ভার্ড বা অক্সফোর্ডের মতো বিশ্বসেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার খরচ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দলটি। বিএনপিও শিক্ষাব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের আভাস দিয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে 'ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব' উদ্যোগ এবং মাধ্যমিক স্তরে বাধ্যতামূলক কারিগরি শিক্ষা।

অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও বাস্তবায়ন 

দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এই প্রতিশ্রুতিগুলোর জন্য বড় বাধা। জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪-৫ শতাংশে নেমে এসেছে এবং রাজস্ব আহরণ (ট্যাক্স-টু-জিডিপি রেশিও) ৭ শতাংশের নিচে, যা ভারত (১২%) বা পাকিস্তানের (১০%) তুলনায় অনেক কম। 

অর্থনীতিবিদ হোসেন জিল্লুর রহমানের মতে, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সামষ্টিক অর্থনীতিতে কিছুটা স্থিতিশীলতা আনলেও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন অভাব ও স্থবির ব্যবসা-বাণিজ্য পুনরুদ্ধারে যথেষ্ট মনোযোগ দিতে পারেনি। নির্বাচনী ডামাডোলে তরুণ ভোটাররা এই আশ্বাসগুলোকে ইতিবাচকভাবে দেখলেও তাদের মূল দাবি একটি সুস্থ কর্মসংস্থান বাজার এবং মেধাভিত্তিক নিয়োগ প্রক্রিয়া। 

বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক দলগুলো যদি এই প্রতিশ্রুতিগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের উৎস এবং বাস্তবায়নের রূপরেখা স্পষ্ট করতে না পারে, তবে এগুলো কেবল 'নির্বাচনী গালগল্প' হিসেবেই থেকে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

 

এই বিভাগের আরও খবর


সর্বশেষ