img

বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের উপকূলে যে সামরিক শক্তি বাড়াচ্ছে, তা ওয়াশিংটনের সম্ভাব্য সামরিক হামলার ইঙ্গিত হতে পারে। নিউক্লিয়ার শক্তিচালিত বিমানবাহী রণতরী USS Abraham Lincoln সাম্প্রতিক দিনে আরব সাগরে মোতায়েন করা যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক সামরিক সম্পদের মধ্যে অন্যতম।

এর আগে, গত বছরের জুনে ১২ দিনের ইরান–ইসরাইল যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র একইভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সামরিক সম্পদ জড়ো করেছিল। সে সময় যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্র ইসরায়েলের পক্ষে অবস্থান নিয়ে ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় ব্যাপক বোমাবর্ষণ চালায়।

এছাড়া গত বছরের শেষ দিকে, ভেনেজুয়েলার নৌযানগুলো যুক্তরাষ্ট্রে মাদক পাচার করছে—এমন অভিযোগ তুলে (যার পক্ষে কোনো প্রমাণ দেওয়া হয়নি) যুক্তরাষ্ট্র ক্যারিবীয় অঞ্চলে সামরিক সম্পদ জড়ো করে। কয়েক সপ্তাহ পর, ৩ জানুয়ারি এক সামরিক অভিযানে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে কারাকাস থেকে অপহরণ করা হয়।

ইরানে গণবিক্ষোভ ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া

ডিসেম্বরের শেষ দিক থেকে ইরানে ব্যাপক গণবিক্ষোভ শুরু হয়। প্রথমে মানুষ দেশটির দুর্বল মুদ্রাব্যবস্থা নিয়ে বিক্ষোভ করলেও পরে তা সরকার পতনের দাবিতে রূপ নেয়। অভিযোগ রয়েছে, এসব বিক্ষোভ দমনে ইরানি নিরাপত্তা বাহিনী ব্যাপক হত্যাকাণ্ড চালায়।

ইরান বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদনকারী জানান, অন্তত ৫ হাজার বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন এবং হাজার হাজার মানুষকে আটক করা হয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে ইরানের ধর্মীয় নেতাদের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে বলেন, ‘সহায়তা আসছে,’ এবং হুঁশিয়ারি দেন—যদি বন্দিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক পদক্ষেপ নেবে।

এই মাসের শুরুতে ট্রাম্প তার অবস্থান কিছুটা নরম করেন। তিনি বলেন, ইরান সরকার তাকে আশ্বস্ত করেছে যে কোনো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে না। পরে, বিক্ষোভ দমন হওয়ার পর তিনি দাবি করেন, তার কারণেই পরিকল্পিত মৃত্যুদণ্ড বন্ধ হয়েছে—যদিও ইরান এই দাবি অস্বীকার করেছে।

তবুও, ট্রাম্পের কড়া বক্তব্য এবং ইরানের উপকূলে যুক্তরাষ্ট্রের অস্বাভাবিক সামরিক মোতায়েন ইঙ্গিত দিচ্ছে যে হামলা আসন্ন হতে পারে—এমনটাই মনে করছেন কিছু বিশ্লেষক।

গত বৃহস্পতিবার এয়ার ফোর্স ওয়ান-এ সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘যদি প্রয়োজন হয়’—এই প্রস্তুতির অংশ হিসেবেই সামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমাদের একটি বিশাল নৌবহর ওই দিকে যাচ্ছে। হয়ত আমাদের এটি ব্যবহার করতেই হবে না।’

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ইরান যদি বিক্ষোভকারীদের ফাঁসি দেয়, তবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রতিক্রিয়া জুন মাসের পারমাণবিক হামলাকে ‘তুচ্ছ’ বলে মনে হবে।

যুক্তরাষ্ট্র কী কী সামরিক সম্পদ মোতায়েন করেছে?

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) সোমবার এক্স (সাবেক টুইটার)-এ জানায়, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে USS Abraham Lincoln মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয়েছে।

ক্যালিফোর্নিয়ার সান ডিয়েগো থেকে যাত্রা করা এই রণতরীটি নভেম্বর থেকে দক্ষিণ চীন সাগরে অবস্থান করছিল।

মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের এয়ার ফোর্সেস সেন্ট্রাল কমান্ড (AFCENT) তাদের অধীন ২০টিরও বেশি দেশে ‘বহুদিনব্যাপী প্রস্তুতি মহড়া’ চালানোর ঘোষণা দেয়। এসব দেশ মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া ও আফ্রিকাজুড়ে অবস্থিত।

AFCENT জানায়, এই মহড়ার লক্ষ্য হলো দ্রুত বাহিনী মোতায়েনের সক্ষমতা বাড়ানো এবং ‘নমনীয় প্রতিক্রিয়া’র জন্য প্রস্তুত থাকা।

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক সামরিক উপস্থিতি রয়েছে। ২০২৪ সাল থেকে ইয়েমেনের হুথিদের প্রতিরোধে এই উপস্থিতি আরও বাড়ানো হয়েছে। ২০২৫ সালের জুন নাগাদ সেখানে প্রায় ৪০,০০০ মার্কিন সেনা অবস্থান করছিল।

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি রয়েছে বাহরাইন, মিসর, ইরাক, ইসরায়েল, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব, সিরিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে। ওমান ও তুরস্কেও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা আছে।

২০২৫ সালের ২৩ জুন, যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার জবাবে ইরান কাতারের আল উদেইদ বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। এতে কেউ হতাহত হয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, এটি ছিল মূলত একটি প্রতীকী বা ‘মুখরক্ষার’ হামলা।

USS Abraham Lincoln-এর সামরিক সক্ষমতা

USS Abraham Lincoln (CVN-72) হলো একটি ভাসমান বিমানঘাঁটি এবং এতে ৬,০০০–৭,০০০ নাবিক ও মেরিন সদস্য থাকে।

৩৩৩ মিটার দীর্ঘ এই রণতরীটি নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টর দ্বারা চালিত এবং বহু বছর জ্বালানি ছাড়াই চলতে পারে। এটি ঘণ্টায় ৫৬ কিলোমিটার গতিতে চলতে সক্ষম।

এর সঙ্গে অন্তত তিনটি Arleigh Burke শ্রেণির ডেস্ট্রয়ার রয়েছে, যেগুলো টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষায় সক্ষম।

এই বহরের বিমান শাখা Carrier Air Wing 9, যার কাছে প্রায় ৬৫টি যুদ্ধবিমান রয়েছে, মূলত F/A-18 সুপার হর্নেট।

জুন ২০২৫-এর মার্কিন হামলা কীভাবে হয়েছিল?

২২ জুন ২০২৫-এর রাতে যুক্তরাষ্ট্র অপারেশন‘মিডনাইট হ্যামার’ নামে এক সমন্বিত অভিযানে ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়।

ফোরদো, নাতাঞ্জ ও ইসফাহান—এই তিনটি স্থাপনায় একযোগে আঘাত হানা হয়। অভিযানে অংশ নেয় প্রায় ৪,০০০ মার্কিন সেনা ও ১২৫টি বিমান।

ফোরদোতে সাতটি B-2 স্টেলথ বোমারু বিমান থেকে ১২টি শক্তিশালী বাংকার-বাস্টার বোমা ফেলা হয়।

ইসফাহানে একটি গবেষণা কেন্দ্রে সাবমেরিন থেকে ২৪টিরও বেশি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়।

এটি ছিল ইরানের ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম সরাসরি সামরিক হামলা।

যুক্তরাষ্ট্র কি আবার হামলার জন্য প্রস্তুত?

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সামরিক সমাবেশ সীমিত পরিসরের হামলার ইঙ্গিত দিতে পারে, যা মূলত ইরানি সরকারের বিরুদ্ধে হতে পারে। ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস-এর এলি গেরানমায়েহ বলেন, মানবাধিকার রক্ষার অজুহাতে যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালাতে পারে। তবে এর ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি।

অন্যদিকে, ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের আলি ভায়েজ বলেন, বিক্ষোভ ইতোমধ্যে দমন হওয়ায় এখন হামলার যৌক্তিকতা দুর্বল। তিনি সতর্ক করেন, যেকোনো সামরিক সংঘর্ষে ৯২ মিলিয়ন ইরানি জনগণই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

এই বিভাগের আরও খবর