যে ৮ সিনেমা দিয়ে বলিউডের ‘অ্যাংরি ইয়ং ম্যান’ উপাধি পান অমিতাভ বচ্চন
১৯৭০-এর দশকের আগে ভারতীয় সিনেমার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন রোমান্টিক নায়করা। হালকা প্রেম, গান আর নৈতিকভাবে নিখুঁত নায়ক—এই ফর্মুলাই চলছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দর্শকদের চাহিদা বদলাতে শুরু করে। সমাজে বাড়তে থাকা বৈষম্য, দুর্নীতি ও হতাশার প্রতিফলন বড় পর্দায় দেখার আগ্রহ ছিল সাধারণ মানুষের। তাদের এমন এক নায়কের জন্য আকাঙ্খা ছিল, যিনি অন্যায় মেনে নেবেন না—বরং রুখে দাঁড়াবেন।
এই শূন্যস্থানেই আবির্ভাব ঘটে বলিউডের শাহেনশাহ খ্যাত অমিতাভ বচ্চনের। লম্বা দেহ, গভীর কণ্ঠস্বর ও তীক্ষ্ণ উপস্থিতি তাকে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ও প্রতিবাদের প্রতীক করে তোলে। তিনি পর্দায় এমন এক নায়ককে তুলে ধরেন, যিনি নিখুঁত নন—বরং ত্রুটিপূর্ণ, ক্ষুব্ধ কিন্তু বাস্তবতার সঙ্গে ভীষণ সামঞ্জস্যপূর্ণ। এভাবেই ইন্ডাস্ট্রিতে জন্ম নেয় ‘অ্যাংরি ইয়ং ম্যান’।
দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে অমিতাভ বচ্চন একজন সংগ্রামী অভিনেতা থেকে বলিউডের সর্ববৃহৎ সুপারস্টারে পরিণত হন। তার অভিনীত চরিত্রগুলো আজও জনপ্রিয় কারণ ন্যায়বিচার, পরিবার আর আত্মসম্মানের জন্য লড়াই—কখনোই পুরোনো হয় না।
১. জঞ্জির (১৯৭৩):
‘জঞ্জির’ ছবিতে অমিতাভ বচ্চন অভিনয় করেন ইন্সপেক্টর বিজয় খান্নার চরিত্রে। ছোটবেলায় বাবা-মায়ের হত্যার সাক্ষী হওয়ার পর, অপরাধীদের ধরাই হয়ে ওঠে তার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য।
দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থার মুখোমুখি হয়ে বিজয় বুঝতে পারে, শুধুমাত্র আইন মেনে চললেই ন্যায়বিচার পাওয়া যায় না। তার এই অন্তর্দ্বন্দ্ব ও ক্ষোভই বলিউডকে দেয় এক নতুন ধরনের নায়ক—যিনি নিজের যন্ত্রণাকে শক্তিতে রূপান্তর করেন।
২. দিওয়ার (১৯৭৫):
‘দিওয়ার’ এক শক্তিশালী ক্রাইম ঘরানার ছবি, যেখানে দুই ভাইয়ের বিপরীত জীবনদর্শন তুলে ধরা হয়েছে। অমিতাভ বচ্চন এখানে বিজয় ভার্মা চরিত্রে অভিনয় করেন। বিজয় এমন একজন মানুষ, যিনি দারিদ্র্যের চাপে পড়ে আন্ডারওয়ার্ল্ডে প্রবেশ করেন।
একদিকে তার ভাই একজন সৎ পুলিশ অফিসার, অন্যদিকে বিজয় হয়ে ওঠে শক্তিশালী চোরাকারবারী। সমাজের অবহেলা, শ্রেণিবৈষম্য আর ভাঙতে থাকা পারিবারিক বন্ধন—সব মিলিয়ে বিজয় এমন এক চরিত্র, যিনি নিজেকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন মনে করেন এবং নিজের নিয়মে বাঁচতে চান।
৩. শোলে (১৯৭৫):
অ্যাকশনে ভরা ‘শোলে’-তে অমিতাভ বচ্চন জয় চরিত্রে হাজির হন—নির্লিপ্ত, সংযত ও দৃঢ়চেতা। আবেগপ্রবণ বীরুর (ধর্মেন্দ্র) বিপরীতে জয় কথা কম বলেন, কাজ বেশি করেন।
শুষ্ক রসবোধ আর গভীর আনুগত্যে ভরা এই চরিত্রটি ‘অ্যাংরি ইয়ং ম্যান’-এর ভাবমূর্তিকে আরও শক্ত করে তোলে—যিনি কঠোর, কিন্তু বন্ধুর জন্য সবকিছু করতে প্রস্তুত।
৪. খুন পাসিনা (১৯৭৭):
অমিতাভ বচ্চন ও বিনোদ খান্নার যুগল উপস্থিতিতে ‘খুন পাসিনা’ দর্শকদের দেয় দুই ধরনের রাগী নায়ক। শৈশবে বিচ্ছিন্ন দুই বন্ধুর পুনর্মিলন এবং শেষে কাদের খান অভিনীত জালিম সিংয়ের বিরুদ্ধে একজোট হওয়া—ছবিটিকে করে তোলে উত্তেজনাপূর্ণ। হারানোর পর খুঁজে পাওয়ার গল্পে বন্ধুত্ব, ক্ষোভ ও ন্যায়বোধ একসঙ্গে মিশে যায়।
৫. ত্রিশুল (১৯৭৮)
‘ত্রিশুল’-এ বচ্চন বিজয় চরিত্রে অভিনয় করেন, যিনি তার মাকে ত্যাগ করা বাবার সাম্রাজ্য ধ্বংস করতে শহরে আসেন। এখানে অ্যাকশনের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় বিজয়ের বুদ্ধি ও কৌশল।
এই ছবিতে অ্যাংরি ইয়ং ম্যান শুধুই রাগী নন—তিনি উচ্চাকাঙ্ক্ষী, তীক্ষ্ণ এবং সিস্টেমের নিয়ম ব্যবহার করেই প্রতিশোধ নেন।
৬. কালা পাত্থার (১৯৭৯):
কয়লা খনিকে কেন্দ্র করে তৈরি ‘কালা পাত্থার’-এ অভিনেতার চরিত্রের নাম বিজয় পাল সিং। তিনি একজন সাবেক নৌবাহিনীর ক্যাপ্টেন, যিনি অপরাধবোধ থেকে পালিয়ে কঠিন জীবন বেছে নেন।
শ্রমিকদের শোষণ ও এক লোভী খনি মালিকের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মাধ্যমে ছবিটি শ্রমিক শ্রেণীর সংগ্রামকে তুলে ধরে। বিজয়ের আত্মত্যাগ ও সাহস তাকে মানবিক নায়কে রূপ দেয়।
৭. লাওয়ারিস: (১৯৮১):
‘লাওয়ারিস’ ছবির গল্প হীরা নামের এক অনাথ যুবককে ঘিরে, যিনি সমাজ ও জন্মদাতা পিতার দ্বারা প্রত্যাখ্যানের শিকার। অমিতাভ বচ্চন অভিনীত এই চরিত্রটি এমন এক সমাজে নিজের মর্যাদা ও পরিচয় প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করে, যেখানে জন্ম ও বংশকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়। ধনী ও ক্ষমতাবানদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে তার প্রতিবাদ প্রমাণ করে- মানুষের মূল্য জন্মে নয়, তার কর্ম ও মানবিকতায় নির্ধারিত হয়।
৮. শক্তি (১৯৮২):
‘শক্তি’ ছবিতে বাবা-ছেলের সম্পর্কের টানাপোড়েনই ছিল গল্পের মূল উপজীব্য। অমিতাভ এতে বিজয় চরিত্রে এমন এক ছেলে, যে মনে করে তার বাবা—একজন কঠোর পুলিশ অফিসার, যিনি আইনকে সন্তানের চেয়েও বেশি ভালোবাসেন।
এই অবহেলাবোধই তাকে অপরাধের দিকে ঠেলে দেয়। সিনেমাটি দেখায় আবেগ ও বোঝাপড়ার অভাব কীভাবে একজন মানুষকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যেতে পারে।

