img

রাজশাহী মহানগরীর হালনাগাদ জনসংখ্যা প্রায় ১০ লাখ ১৩ হাজার ৮৬৭ জন। জেলার জনসংখ্যা ৩০ লাখ ২৩ হাজার ১৭৮ জন। জেলা ও মহানগরী মিলে পরিবারের সংখ্যা ৭ লাখ ৭৬ হাজার ২৪৫টি। রাজশাহী ও মহানগরী মিলে দৈনিক এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডারের চাহিদা ৩৫ থেকে ৪০ হাজারটি।

গত তিন সপ্তাহ ধরে রাজশাহীতে এলপিজি সিলিন্ডার সরবরাহ হচ্ছে মোট চাহিদার ৫ ভাগের এক ভাগ। সিলিন্ডারের এই সংকটে বেশি দামেও মিলছে না গ্যাস। সিলিন্ডার পেতে এক সপ্তাহ আগে দোকানিকে অর্ডার দিতে হচ্ছে। তারপরও গুনতে হচ্ছে দ্বিগুণ দাম।

অনেকের রান্নাঘরের গ্যাস শেষ হয়েছে; কিন্তু দোকানে গিয়ে পাচ্ছেন না সিলিন্ডার।

ভুক্তভোগীরা বলছেন, এমন পরিস্থিতি অসহনীয়। এখন গ্যাসের বিকল্প হিসেবে খড়ি-কাঠ দিয়ে রান্না করাও সম্ভব নয়।

জানা গেছে, রাজশাহী মহানগরীতে পাইপ লাইনে মাত্র ৯ হাজার ১৫৭টি সংযোগ রয়েছে বিভিন্ন বাসাবাড়িতে। বাকিরা এলপি সিলিন্ডারে রান্নার কাজ করেন।

ভুক্তভোগী ক্রেতা, খুচরা বিক্রেতা ও এলপিজি সিলিন্ডারের ডিলার এজেন্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকেই রাজশাহী অঞ্চলের এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডারের সংকট তৈরি হয়। দাম বাড়বে এমন অজুহাতে কোম্পানিগুলো ডিলার ও এজেন্টদের সিলিন্ডার সরবরাহ কমিয়ে অর্ধেকে নামিয়ে আনে।

রাজশাহী লক্ষ্মীপুর বাজারের খুচরা গ্যাস বিক্রেতা সাইফুল হক জানান, ডিসেম্বরের ২৫ তারিখ পর্যন্ত আমরা সোয়া ১২ কেজির প্রতিটি সিলিন্ডার বিক্রি করেছি ১ হাজার ২৫৩ টাকায়। জানুয়ারি থেকে সিলিন্ডারপ্রতি ৫৩ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৩০৬ টাকা করা হয়েছে। এরপর থেকেই এলপি সিলিন্ডারের সরবরাহ আরও কমে গেছে। সরবরাহ না পেলে আমরা গ্রাহকদের কিভাবে সিলিন্ডার দেব- নিজেই প্রশ্ন করেন এই খুচরা বিক্রেতা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজশাহী মহানগরী ও আশপাশের এলাকায় এলপিজি গ্যাসের সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। গৃহস্থালি থেকে শুরু করে হোটেল-রেস্তোরাঁ- সর্বত্রই রান্নার এলপিজির জন্য চলছে হাহাকার। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ পাঁচ ভাগের এক ভাগে নেমে আসায় একদিকে যেমন মিলছে না সিলিন্ডার, অন্যদিকে সুযোগ বুঝে নেওয়া হচ্ছে অতিরিক্ত দাম।

বৃহস্পতিবার নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ খুচরা বিক্রেতার কাছে সিলিন্ডারের মজুত নেই বললেই চলে। কোথাও কোথাও পাওয়া গেলেও সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে দ্বিগুণ দামে কিনতে হচ্ছে।

নগরীর ছোট বনগ্রাম এলাকার বাসিন্দা সোহেল রানা জানান, গত ৩ জানুয়ারি তার রান্নার সিলিন্ডারের গ্যাস শেষ হয়েছে। তিনি আশপাশের শালবাগান ও নওদাপাড়া বাজারের তিনটি দোকানে ঘুরেছেন একটি সিলিন্ডারের জন্য; কিন্তু ওই দিন পাননি সিলিন্ডার। দুই দিন পর ৫ জানুয়ারি একটি সিলিন্ডার ম্যানেজ করেছেন ২ হাজার ৩৫০ টাকায়। মাঝের দুই দিন রান্না করাই যায়নি।

পদ্মা আবাসিক এলাকার বাসিন্দা সুতলানা শারমিন জানান, একটা ছেলে তার বাসায় গ্যাস সিলিন্ডার দিতেন। গ্যাস শেষ হলে তার সঙ্গে যোগাযোগ করি; কিন্তু সে জানায় গ্যাস নাই। বেশি টাকা দিলে সাহেববাজার থেকে এনে দেবেন। বাধ্য হয়ে ২ হাজার ৫০০ টাকা দিয়ে আপাতত একটা সিলিন্ডার পেয়েছি।

এদিকে এলপি সিলিন্ডারের তীব্র সংকটের প্রভাব পড়েছে রাজশাহীর খাওয়ার হোটেল-রেস্তোরাঁগুলোতেও। গণকপাড়ার হোটেল মালিক আব্দুর রহমান জানান, পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ।

তিনি জানান, প্রতিদিন তার হোটেলে চারটা বড় সিলিন্ডার লাগে।  বড় সিলিন্ডার কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কয়েকজন ডিলারের কাছে সিলিন্ডার চেয়েছি; কিন্তু তারা বলছেন বড় সিলিন্ডার সরবরাহ নেই। ছোটগুলো নিলে দিতে পারবেন। বাধ্য হয়ে ছোট সিলিন্ডার দিয়েই হোটেলের রান্না চলছে। তবে জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য অনেক কিছুই রান্না করা বন্ধ করেছেন।

সাহেববাজার এলাকার হোটেল মালিক শাকিল হোসেন বলেন, হোটেলে প্রতিদিনের জ্বালানি  খরচ অনেক বেশি। এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে হোটেল বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না।

তিনি আরও জানান, ইতোমধ্যে তার আশপাশের কয়েকটি  রেস্তোরাঁ  সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে।

অন্যদিকে সিলিন্ডারের খুচরা বিক্রেতারা চলমান সংকটের জন্য সরবরাহে অনিয়মকে দায়ী করছেন। নওদাপাড়া বাজার এলাকার গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রেতা আবদুস সালাম বলেন, কয়েক সপ্তাহ ধরেই সরবরাহ অনিয়মিত। চাহিদার তুলনায় অনেক কম সিলিন্ডার পাচ্ছি। ক্রেতারা মনে করেন আমরা মজুত করছি, কিন্তু আমাদের কাছে মজুত নেই।

নগরীর গ্রেটার রোডের বড় এজেন্সি মেসার্স হালিমার ব্যবস্থাপক পারভেজ হোসেন জানান, আগে প্রতিদিনই গ্যাস দিতে গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকত। এখন সপ্তাহে এক-দুই দিন চালান আসে। তাও পরিমাণ কম। সরবরাহ না থাকায় আমরা কাউকে চাহিদামতো সিলিন্ডার দিতে পারছি না কাউকে।

ওমেরা কোম্পানির পরিবেশক আনন্দ কুমার সাহা জানান, আগে যেখানে প্রতিদিন যে পরিমাণ সিলিন্ডার সরবরাহ মিলত, সেখানে এখন সপ্তাহে মাত্র দুই দিন গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। আজ যে সিলিন্ডার পেয়েছি, সবই বিক্রি ও বিতরণ হয়ে গেছে। পরবর্তী সরবরাহ আসার কথা শুক্রবার। এ সময় কেউ সিলিন্ডার চাইলে আমরা দিতে পারব না। সিলিন্ডার নিয়ে আমরাও বিপদে আছি। মানুষ মনে করছে আমরা সংকটের জন্য দায়ী; কিন্তু কোম্পানি সরবরাহ না দিলে আমরা কী করতে পারি।

রাজশাহী এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফারুক হোসেন কচি জানান, রাজশাহীতে দৈনিক ৩৫ থেকে ৪০  হাজার গ্যাস সিলিন্ডারের চাহিদা। সেখানে আমরা পাঁচ ভাগের এক ভাগ পাচ্ছি। আমরা সরকার নির্ধারিত দামের এক পয়সাও বেশি রাখি না; কিন্তু যারা আমাদের কাছ থেকে কিনে ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করেন তারা হয়তো কিছুটা বেশি দাম নিয়ে থাকেন।

জানা গেছে, রাজশাহীতে ১৮টি কোম্পানি এলপি গ্যাস সিলিন্ডার সরবরাহ করে থাকে। তবে বর্তমানে শুধুমাত্র এমবি, সান, যমুনা ও আই গ্যাস মিলে মোট ৪টি কোম্পানির সিলিন্ডার আসছে তাও সীমিতভাবে। কবেনাগাদ সংকট কাটবে তা কেই বলতে পারছে না।

এই বিভাগের আরও খবর


সর্বশেষ