img

২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ১৫ বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটার পর থেকে বাংলাদেশ গভীর রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

১৭ কোটি মানুষের মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ এই দেশটি আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি গণঅভ্যুত্থানের পর প্রথমবারের মতো জাতীয় নির্বাচন আয়োজন করতে যাচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি হবে ‘২০২৬ সালের বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া’।

নির্বাচনকে ঘিরে প্রধান রাজনৈতিক শক্তি ও প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হলো—

অন্তর্বর্তী সরকার

নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস (৮৫) ২০২৪ সালের আগস্টে আন্দোলনকারীদের আহ্বানে বিদেশ থেকে দেশে ফিরে ‘চিফ অ্যাডভাইজার’ হিসেবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নেতৃত্ব নেন। নির্বাচন শেষে তিনি দায়িত্ব ছাড়বেন।

ইউনূস বলেছেন, তিনি একটি ‘সম্পূর্ণ ভেঙে পড়া’ রাজনৈতিক ব্যবস্থা উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছেন। কর্তৃত্ববাদী শাসনে প্রত্যাবর্তন ঠেকাতে তিনি যে সংস্কার সনদ প্রস্তাব করেছেন, তা অত্যাবশ্যক বলে দাবি করেন। এসব প্রস্তাবিত সংস্কারের ওপর একই দিনে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সংস্কারগুলো নির্বাহী, বিচার বিভাগ ও আইনসভারের মধ্যে ভারসাম্য ও জবাবদিহি শক্তিশালী করবে।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)

তারেক রহমানের (৬০) নেতৃত্বাধীন বিএনপি আসন্ন নির্বাচনে জয়ী হওয়ার সবচেয়ে সম্ভাব্য দল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দীর্ঘ ১৭ বছর নির্বাসনে থাকার পর তিনি ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে দেশে ফেরেন।

তার প্রত্যাবর্তনের কয়েক দিনের মধ্যেই তার মা, বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ৮০ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।

বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটে বাম ও মধ্যপন্থী দলগুলোর পাশাপাশি কয়েকটি ছোট ইসলামপন্থী দলও রয়েছে।

ইসলামপন্থী নেতৃত্বাধীন জোট

দেশের সবচেয়ে বড় ও সংগঠিত ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামী শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে নিষেধাজ্ঞা ও দমন-পীড়নের মুখে পড়ার পর আবারো আনুষ্ঠানিক রাজনীতিতে ফিরতে চাইছে। দলটি আদর্শগতভাবে মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ।

জামায়াতের নেতৃত্বে ১০টির বেশি ছোট দলের একটি জোট গঠিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), যেটি গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রনেতাদের দ্বারা গঠিত। এছাড়া ছোট লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি এবং কয়েকটি প্রান্তিক ইসলামপন্থী দলও এতে যুক্ত, যাদের অধিকাংশই অতীতের সংসদগুলোতে অল্প কয়েকটি আসন পেয়েছিল।

ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তানের পর বিশ্বের অন্যতম জনবহুল মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ বাংলাদেশে ইসলামের নানা ধারার চর্চা রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সুফি সম্প্রদায়ও রয়েছে, যাদের প্রায়ই কট্টর ইসলামপন্থীরা সমালোচনা করে।

বাংলাদেশের প্রায় ১০ শতাংশ মানুষ অমুসলিম। তাদের মধ্যে অধিকাংশই হিন্দু, পাশাপাশি অল্পসংখ্যক খ্রিস্টানও রয়েছে।

আওয়ামী লীগ

৭৮ বছর বয়সি শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে পলাতক। ২০২৫ সালের নভেম্বরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তার অনুপস্থিতিতে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

তার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ, যা একসময় দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় দল ছিল, বর্তমানে নিষিদ্ধ। দলটির অনুগতরা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে দাঁড়াতে পারেন, তবে একসময় বড় এ দলটির সমর্থকরা কাকে সমর্থন দেবেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এই নিষেধাজ্ঞাকে ‘দমনমূলক’ বলে অভিহিত করেছে। অন্যদিকে শেখ হাসিনা সতর্ক করে বলেছেন, তার দলকে বাদ দিয়ে নির্বাচন হলে তা ভবিষ্যতে আরও বিভাজনের বীজ বপন করবে।

সেনাবাহিনী

সামরিক অভ্যুত্থানের দীর্ঘ ইতিহাস থাকা বাংলাদেশে সেনাবাহিনী এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে বিবেচিত। শেখ হাসিনার পতনে সেনাবাহিনীর ভূমিকা ছিল নির্ণায়ক; তারা আন্দোলন দমনে হস্তক্ষেপ না করার সিদ্ধান্ত নেয়।

বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ বাহিনীর পাশাপাশি সেনাবাহিনীও রাস্তায় টহল দিচ্ছে।

আন্তর্জাতিক প্রভাব

আঞ্চলিক শক্তিগুলো বাংলাদেশের পরিস্থিতির ওপর নিবিড় নজর রাখছে। একসময় শেখ হাসিনার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক এখন শীতল।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে ইউনূসের প্রথম রাষ্ট্রীয় সফর ছিল চীন সফর, যা কৌশলগত দিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে ঢাকা পাকিস্তানের সঙ্গেও যোগাযোগ ও সহযোগিতা বাড়িয়েছে, যা ভারতের দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী।

এই বিভাগের আরও খবর