img

২০২৫ সাল থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে মেমোরি চিপের দাম ধারাবাহিকভাবে বাড়তে শুরু করে, যা ২০২৬ সালে এসে মোটামুটি ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এই মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক স্মার্টফোন শিল্পে। বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে ইতোমধ্যেই মেমোরি চিপের বাড়তি দামের কারণে স্মার্টফোনের খুচরা মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে।

গত দশ বছরে স্মার্টফোন আর শুধু বিলাসপণ্য হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য একটি উপকরণ। যোগাযোগের পাশাপাশি অফিসের কাজ, পড়াশোনা, ডিজিটাল লেনদেন, সরকারি ও বেসরকারি সেবা গ্রহণ, সামাজিক যোগাযোগ, বিনোদন এবং অনলাইন কেনাকাটার মতো নানা কাজে স্মার্টফোনের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বেড়েছে। সব শ্রেণি ও আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার কেন্দ্রে এখন এই ডিভাইস।

স্মার্টফোনের ওপর নির্ভরতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভোক্তাদের মূল্যবোধেও পরিবর্তন এসেছে। ক্রেতারা এখন এমন ডিভাইস চান যা দামে সাশ্রয়ী হওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘদিন ভালো পারফরম্যান্স দিতে সক্ষম। বাংলাদেশের মতো মূল্যসংবেদনশীল বাজারে গ্রাহকরা দামের সঙ্গে ফিচারের ভারসাম্যকে বেশি গুরুত্ব দেন এবং স্মার্টফোনকে বিলাসিতা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি প্রয়োজন হিসেবে বিবেচনা করেন।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে স্মার্টফোনের দামে চোখে পড়ার মতো বৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে ভারত ও ইন্দোনেশিয়ায় স্মার্টফোনের দাম বাড়ানো হয়। একই বছরের ডিসেম্বরে নেপালেও নতুন দাম কার্যকর হয়। বাংলাদেশে ২০২৬ সাল থেকে এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। বর্তমানে বাজারের বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে স্মার্টফোনের দাম গড়ে ১০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই মূল্যবৃদ্ধির প্রধান কারণ হলো ২০২৫ সালের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে ডিআরএএম ও এনএএনডি ফ্ল্যাশ মেমোরি চিপের দাম বেড়ে যাওয়া। ওই সময়ে ডিআরএএম চিপের দাম ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়, আর এনএএনডি ফ্ল্যাশের দাম বাড়ে প্রায় ৫ থেকে ১০ শতাংশ। এই প্রবণতা ২০২৬ সালেও অব্যাহত রয়েছে এবং চলতি বছরের শুরুতে মোট মেমোরি চিপের মূল্যবৃদ্ধি ৫৫–৬০ শতাংশে পৌঁছেছে। এর ফলে স্মার্টফোনের উৎপাদন খরচ ও বিক্রয়মূল্য দুটোই বেড়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মেমোরি সংকটের বড় একটি কারণ হলো উৎপাদিত মেমোরির উল্লেখযোগ্য অংশ এখন এআই-ভিত্তিক ডেটা সেন্টার ও ক্লাউড অবকাঠামোর দিকে চলে যাচ্ছে, যেখানে চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। এর ফলে স্মার্টফোন শিল্পের জন্য মেমোরি সরবরাহ তুলনামূলকভাবে সীমিত হয়ে পড়ছে। পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের স্মার্টফোনে অন-ডিভাইস এআই ফিচার যুক্ত হওয়ায় বেশি র‍্যাম ও শক্তিশালী প্রসেসরের প্রয়োজন হচ্ছে, যা উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

এই ব্যয়বৃদ্ধির প্রভাব সব ধরনের স্মার্টফোনে সমানভাবে পড়ছে না। সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়েছে বাজেট বা এন্ট্রি-লেভেল স্মার্টফোন। বিশ্লেষকদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সাল থেকে ২০০ ডলারের নিচের ফোনগুলোর উপকরণ খরচ ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে, যা ২০২৬ সালে আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।

মিড-রেঞ্জ স্মার্টফোনের ক্ষেত্রেও উৎপাদন ব্যয় প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বেড়েছে। প্রিমিয়াম বা হাই-এন্ড স্মার্টফোনগুলো তুলনামূলকভাবে এই চাপ সামাল দিতে পারলেও, সেগুলোর উপকরণ খরচও ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ায় দাম বাড়ানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

তবে সব নির্মাতা এই পরিস্থিতিতে সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না। যেসব ব্র্যান্ডের গড় বিক্রয়মূল্য বেশি, তারা তুলনামূলকভাবে সহজে এই খরচ সামাল দিতে পারছে। বিপরীতে কম মুনাফায় ব্যবসা করা ব্র্যান্ডগুলো, বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো বাজারে, বেশি চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এআই-কেন্দ্রিক চাহিদার কারণে বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহ ব্যবস্থায় যে পরিবর্তন এসেছে, তা দ্রুত স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা কম। ফলে ২০২৬ সালের পরেও স্মার্টফোনের দামের ওপর চাপ অব্যাহত থাকতে পারে।

আন্তর্জাতিক সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় বাংলাদেশের স্মার্টফোন বাজারেও এই বৈশ্বিক মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব স্পষ্টভাবে অনুভূত হচ্ছে। ধীরে ধীরে ভোক্তারাও বুঝতে পারছেন, এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে স্থানীয় কোনো কারণ নয়; বরং বৈশ্বিক উৎপাদন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি মূল ভূমিকা রাখছে।

এই বিভাগের আরও খবর