Ads
img

গ্রাহক পণ্য বুঝে পাওয়ার পর ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে অর্থছাড়ের যে নীতিমালা জারি করা হয়েছে, সেটির বাস্তবায়ন এখনো শুরু হয়নি। ফলে আগের মতোই অগ্রিম অর্থ পরিশোধ সাপেক্ষে পণ্য বিক্রির কার্যক্রম অব্যাহত আছে ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে। অর্থাত্ ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে গ্রাহক ঠকানোর পথ এখনো খোলা রয়েছে। বিষয়টি স্বীকারও করেছে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্যোক্তাদের সংগঠন ই-ক্যাব। সংগঠনটি জানিয়েছে, এখনো তাদের সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলো বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশিকা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে পারেনি। এ বিষয়ে সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাগিদ দিয়ে চলতি সপ্তাহেই চিঠি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ই-ক্যাব।

অন্যদিকে ই-কমার্স লেনদেন নিষ্পত্তির দায়িত্ব পালনকারী ব্যাংক, এমএফএস ও ই-ওয়ালেট প্রতিষ্ঠানগুলোও নীতিমালা বাস্তবায়ন শুরু করতে পারেনি। এ ছাড়া যে ব্যাংকগুলো ইভ্যালিসহ ১০টি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কার্ডে লেনদেন বন্ধ করে দিয়েছিল, সেই ব্যাংকগুলো এখনো সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়নি।

ইভ্যালিসহ বিভিন্ন ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অগ্রিম টাকা নিয়ে নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ না করার যে অভিযোগ আছে, তা একটি শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে গত ৩০ জুন ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে লেনদেন নিষ্পত্তি নিয়ে নীতিমালা জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই নীতিমালায় বলা হয়, গ্রাহক পণ্য বুঝে পাওয়ার পর ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান দাম পাবে। এই লেনদেন নিষ্পত্তিতে মধ্যস্থতা করবে ব্যাংক, এমএফএস ও ই-ওয়ালেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, ই-কমার্স খাতের যথাযথ বিকাশ, পরিশোধ সেবা প্রদানকারীদের ঝুঁকি নিরসন, গ্রাহক স্বার্থ সংরক্ষণ ও ই-কমার্সের ওপর জনগণের আস্থা ধরে রাখার লক্ষ্যে ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে লেনদেন নিষ্পত্তির নতুন এই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ নীতিমালা মেনে ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে লেনদেন নিষ্পত্তি হলে এই খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মো. মেজবাউল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা যে নীতিমালা দিয়েছি, সেই নীতিমালা মেনে যদি ব্যবসা করে তাহলে গ্রাহকদের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোও সুরক্ষিত থাকবে। যদি কেউ এটা ভায়োলেট করে এবং এটা তদন্তে প্রমাণিত হয় তাহলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

জানা যায়, মার্কেটপ্লেস, কাস্টমার ও পরিশোধ সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান নিয়েই ই-কমার্সের লেনদেন কাঠামো। এই কাঠামোয় লেনদেন নিষ্পত্তি হতে হলে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর সংশ্লিষ্ট পরিশোধ সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানে অ্যাকাউন্ট থাকতে হবে। কারণ পণ্য বিক্রির টাকা ওই অ্যাকাউন্টে জমা হবে এবং গ্রাহক পণ্য বুঝে পেয়েছে এমন ক্লিয়ারেন্সের ভিত্তিতে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর অনুকূলে অর্থ ছাড় করবে পরিশোধ সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান তথা ব্যাংক, এমএফএস ও ই-ওয়ালেট প্রতিষ্ঠান। এ ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম বা নীতিমালা পরিপন্থী কিছু হলে সংশ্লিষ্ট ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানকে সঙ্গে সঙ্গে কারণ দর্শানোর নোটিশ এবং এর জবাব সন্তোষজনক না হলে পরিশোধ সেবা বন্ধ রাখতে পারবে পরিশোধ সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান।

বিভিন্ন ব্যাংক, এমএফএস ও ই-ওয়ালেট প্রতিষ্ঠানে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা এখনো বাস্তবায়ন শুরু হয়নি। জানতে চাইলে বেসরকারি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা তাড়াহুড়া করে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে চাচ্ছি না। এ জন্য নীতিমালায় কী বলা আছে, সেটা বোঝার চেষ্টা করছি। বিশেষ করে ই-কমার্সের সঙ্গে লেনদেন কতটুকু কাভার করে সে বিষয়টি পর্যালোচনা করে দেখছি।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের কার্ড ব্যবহারকারী গ্রাহকদের সুরক্ষার কথা চিন্তা করেই ১০টি ই-কমার্সের সঙ্গে লেনদেন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিই, যা এখনো চালু হয়নি।’

মোবাইলে আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান (এমএফএস) বিকাশের যোগাযোগ বিভাগের প্রধান শামসুদ্দিন হায়দার ডালিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে লেনদেন নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, সেটা নিয়ে আমরা এখন কাজ করছি। এখানে কতগুলো টেকনোলজির ইস্যু আছে। এর বাইরে ছোটখাটো আরো কিছু ইস্যু আছে। এসব বিষয়ে আমাদের রেগুলেটরের সঙ্গে বসে সিরিয়াসলি কাজ করছি।’ তাহলে ই-কমার্সের সব লেনদেন বন্ধ রাখা হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমাদের কোনো লেনদেন বন্ধ নেই। সব লেনদেন চালু আছে। ব্যাংক লেনদেন বন্ধ রেখেছে, কারণ এখানে তাদের টাকাও আটকে যাচ্ছে।’

এদিকে গত ৪ জুলাই ই-কমার্স পরিচালনা নির্দেশিকা ২০২১ জারি করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। ওই নির্দেশিকায় বলা হয়, গ্রাহক মূল্য পরিশোধ করার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সরবরাহকারীর কাছে পণ্য পৌঁছে দেবে বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান। এরপর তা ক্রেতাকে এসএমএস দিয়ে জানিয়ে দেওয়া হবে। ক্রেতা ও বিক্রেতা একই শহরে থাকলে মূল্য পরিশোধের পাঁচ দিনের মধ্যে, আর ভিন্ন শহরে থাকলে ১০ দিনের মধ্যে পণ্য সরবরাহ করতে হবে। তবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ক্ষেত্রে সরবরাহের সময় আরো কম রাখতে হবে। গ্রাহক মূল্য পরিশোধের পর নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করতে ব্যর্থ হলে মূল্য পরিশোধের ১০ দিনের মধ্যে ক্রেতার পুরো টাকা ফেরত দিতে হবে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানকে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালার পাশাপাশি ই-কমার্স পরিচালনায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশিকাও পুরোপুরি প্রতিপালন শুরু হয়নি ই-কমার্স খাতে। এখনো অবাধে আগের নিয়মেই অনলাইনে অগ্রিম অর্থ পরিশোধ সাপেক্ষে পণ্য বিক্রি অব্যাহত রেখেছে অনেক প্রতিষ্ঠান।

জানতে চাইলে ই-ক্যাবের মহাব্যবস্থাপক জাহাঙ্গীর আলম শোভন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে পারেনি। তাই দ্রুত এ নির্দেশনা বাস্তবায়নের তাগিদ দিয়ে শিগগিরই সব সদস্য প্রতিষ্ঠান বরাবর চিঠি ইস্যু করতে যাচ্ছে ই-ক্যাব।’

এই বিভাগের আরও খবর