img

ফুটবলপ্রেমীদের জন্য যথেষ্ট উত্তেজনাপূর্ণ কাটল গত দশ দিন। তর্কযোগ্যভাবে ক্লাব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম খেলোয়াড় কী দুই দশকের সম্পর্কচ্ছেদ করে প্রাণপ্রিয় ক্লাব ছেড়ে চলে যাবেন? চলে গেলে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দলবদল ঘটেই যেত হয়তো। তীক্ষ্ণ নজর রাখছিল ম্যানচেস্টার সিটি, পিএসজি, ইন্টার মিলানের মতো ক্লাবগুলো। যা হোক, সেটা হয়নি। গোল ডটকমকে দেওয়া আবেগঘন এক সাক্ষাৎকারে মেসি জানিয়েছেন, ক্লাব সভাপতির প্রতি তাঁর অসন্তুষ্টির কথা। শেষমেশ মেসি থাকছেন, বার্সা সমর্থকদের জন্য আনন্দের খবর এটাই।

তবে এভাবে আর কত দিন? সংগত কারণেই মেসি জানাননি এই থাকাটা কত দিনের জন্য হচ্ছে। খোলা চোখে যেটা বোঝা যাচ্ছে, ক্লাবের সঙ্গে বর্তমান চুক্তির যেহেতু আর এক বছর বাকি, মেসি সেই চুক্তিকে সম্মান করবেন। থাকবেন অন্তত আরও এক বছর। কিন্তু এর পর? চুক্তিহীন মেসি কি সাড়া দেবেন পেপ গার্দিওলার ডাকে? নাকি বার্সেলোনার সঙ্গেই চুক্তি বাড়াবেন আবার? শেষমেশ ক্যারিয়ারের ইতি টানবেন ক্যাম্প ন্যু-তে?

সাক্ষাৎকারে দুটো জিনিস স্পষ্ট, বার্সেলোনার প্রতি মেসির অশেষ ভালোবাসা, আর ক্লাব সভাপতি জোসেপ মারিয়া বার্তোমেউর প্রতি মেসির অনিঃশেষ বিরক্তি। মেসির কথা মানলে বলতে হয়, তাঁদের মধ্যে সম্পর্ক খারাপ এক দিনে হয়নি। দূরত্ব সৃষ্টি হয়নি রাতারাতি। সভাপতির প্রতি বহুদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ গতকালের এই সাক্ষাৎকার।

মেসি চেয়েছিলেন একটি স্থায়ী সমাধান। চেয়েছিলেন খেলা চালিয়ে যাওয়ার জন্য একটি আদর্শ প্রকল্প, পরিকল্পনা। বছরের পর বছর ধরে বার্তোমেউকে বলে যাওয়ার পরেও যে পরিকল্পনার ছিটেফোঁটাও দেখেননি তিনি। উল্টো বারবার দেখছিলেন, ইনিয়ে-বিনিয়ে ক্লাবের সব ব্যর্থতার জন্য তাঁর নামকে ব্যবহার করা হচ্ছে ঢাল হিসেবে।

গত জানুয়ারির কথাই ধরুন। সাবেক কোচ আর্নেস্তো ভালভার্দের ছাঁটাইয়ের পেছনে মেসিরা কলকাঠি নেড়েছিলেন, ইঙ্গিত দিয়েছিলেন বোর্ড পরিচালক এরিক আবিদাল। শোনা গিয়েছিল নিজের সভাপতিত্ব রক্ষার দায়ে মেসি-পুয়োলদের নাম নষ্ট করতেও পিছপা হননি বার্তোমেউ। আইথ্রি ভেঞ্চার্স নামে এক জনসংযোগ প্রতিষ্ঠানকে প্রয়োজনের চেয়ে ৬০০ শতাংশ বেশি টাকা দিয়ে রাখাই হয়েছিল মেসিদের নামে কুৎসা রটানোর জন্য।

যা রটে, তা যে কিছু হলেও বটে—সেটার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে আস্তে আস্তে।

খোদ কাতালান পুলিশ বিভাগই (লস মোজোস দে এসকাদ্রা) বার্তোমেউর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে। তাঁরা বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট অভিযোগের সমন্বয়ে প্রতিবেদন বানিয়ে বার্সেলোনা আদালতে পাঠিয়েছে। যে প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, নিজের স্বার্থের জন্য বার্সেলোনার নাম ব্যবহার করেছেন বার্তোমেউ। ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে সম্ভাব্য ফৌজদারি অপরাধ করেছেন বার্তোমেউ, বার্সেলোনার সঙ্গে আইথ্রি ভেঞ্চার্সের চুক্তিপত্রে এমন প্রমাণ পেয়েছে বলে জানিয়েছে কাতালান পুলিশ বিভাগ।

পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে, ক্লাবের অভ্যন্তরীণ নীতিকে তোয়াক্কা না করে বাজারমূল্যের চেয়ে ৬০০ শতাংশ বেশি অর্থ দিয়ে জনসংযোগ প্রতিষ্ঠান আইথ্রি ভেঞ্চার্সকে ভাড়া করেছিলেন বার্তোমেউ। কিছুদিন আগে কাতালান সংবাদমাধ্যম ‘কে থি জোগাস’ এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল, আইথ্রি নামের সেই প্রতিষ্ঠানের কাজ ছিল বার্সা সভাপতি হোসে মারিয়া বার্তোমেউর ভাবমূর্তি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উজ্জ্বল করা। আর যেসব বর্তমান ও সাবেক খেলোয়াড়ের সঙ্গে বার্তোমেউর বনে না, তাদের বিরুদ্ধে কুৎসা রটাত এই প্রতিষ্ঠান। কে থি জোগাসের দাবি, ওই প্রতিষ্ঠান এক শর কাছাকাছি টুইটার ও ফেসবুক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ক্লাব কিংবদন্তি মেসি, জাভি, জেরার্ড পিকে, পেপ গার্দিওলা, কার্লেস পুয়োলদের আক্রমণ করত। সাবেক সভাপতি হুয়ান লাপোর্তা ও কাতালান স্বাধীনতাকামী রাজনীতিবিদ কার্লেস পুচ দে মন্তের বিপক্ষেও নেমেছিল আইথ্রি।

একটু ভেবে দেখুন, ক্লাবের কাজ হলো নিজেদের খেলোয়াড়দের যেকোনো মূল্যে রক্ষা করা। এমনকি সমর্থকদের সাফাইও গায় ক্লাব। মুসা মারেগা বর্ণবৈষম্যের শিকার হওয়ায় প্রতিবাদ জানিয়েছে পর্তুগালের ক্লাব এফসি পোর্তো। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর বিপক্ষে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠার পর সর্বোচ্চ সহযোগিতা করেছে ক্লাব জুভেন্টাস। এমনিতেই তারকাদের প্রতিপক্ষের অভাব নেই। মাঠের প্রতিপক্ষ তো আছেই। ছিদ্রান্বেষী সংবাদমাধ্যম আছে। চাইলে ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থার কঠিন নিয়ম কানুনের গায়েও এ ট্যাগ দিয়ে দেওয়া যায়।

এসবের বিরুদ্ধে ক্লাব ও খেলোয়াড় একে অপরের সম্বল। সেখানে কিনা বার্সেলোনা নিজেদের খেলোয়াড়দের বিপদে ফেলে দিচ্ছে। তা-ও মেসিকে! বার্তোমেউই পর্দার আড়ালে আস্তে আস্তে হয়ে উঠেছেন মেসির সবচেয়ে বড় শত্রু! এমন অবস্থায় এক মৌসুম টেকা যায়, দুই মৌসুম টেকা যায়, হয়তো আরও কয়েক বছর থাকা যায়, কিন্তু প্রতিবাদ না করে আর কতকাল? অবস্থার উন্নতি হচ্ছে না যে মোটেও!

এক ক্লাবে সারা জীবন কাটিয়ে দিয়ে ফুটবলপ্রেমীদের চোখের মণি হয়ে আছেন রায়ান গিগস, পল স্কোলস, ফ্রান্সেসকো টট্টি, পাওলো মালদিনির মতো তারকারা। একই কথা খাটে মেসির ক্ষেত্রেও। তবে বাকিদের সঙ্গে মেসির সবচেয়ে বড় পার্থক্য, তাঁদের কেউই ফুটবল ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম তারকার তর্কে আসেননি। মেসি এ দিক দিয়ে অনন্য। সেই মেসিই যখন ক্লাব সভাপতির মুখোশ এভাবে খুলে দেন, ক্লাবের অভ্যন্তরীণ কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কটা আদতেই কী আর আগের জায়গায় থাকে?

হয়তো থাকে না। যে কারণে মেসি থাকছেন এই খবরের শেষে দেখা যায়নি দুই পক্ষের উষ্ণ আলিঙ্গন, করমর্দন কিংবা হাসিমাখা মুখ। বরং উল্টো মেসির হতাশ প্রতিচ্ছবিই মূর্ত হয়ে উঠেছে এই ক্ষেত্রে। ক্লাবের সবচেয়ে বড় তারকা থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, এ খবরে তো এমনটা হওয়ার কথা ছিল না, তাই না?

কারণ মেসির থাকার পেছনে সবচেয়ে বড় উপযাচক হিসেবে কাজ করেছে ক্লাবের সঙ্গে আদালতের নোংরা খেলায় মেতে ওঠার অনীহা। এত দিন ধরে মেসি যে একটা সুনির্দিষ্ট প্রকল্পের জন্য মাথা কুটে কুটে মরছেন—সেটা হয়নি। আর এই কারণটাই আস্তে আস্তে হয়ে উঠেছে দুর্লঙ্ঘ্য। হয়ে উঠেছে মেসি-বার্সা দাম্পত্যে সবচেয়ে বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন—যে চিহ্ন হয়তো আর কখনই দুপক্ষের সম্পর্ককে আগের মতো হতে দেবে না।

বার্সেলোনার পৃথিবীটা তাই মেসির কাছে এখন অচেনা লাগাই স্বাভাবিক। ক্যাম্প ন্যু-তে মেসি নিজেকে মনে করতে পারেন ভিনগ্রহের কেউ।

জিরোআওয়ার২৪/এমএ

এই বিভাগের আরও খবর